নজরুলের কবিতায় “মুর্দা মুসলিমের” ঈদ

06[ফিলিস্তিনিদের আর্তনাদ: নিষ্ফল ঈদের আনুষ্ঠানিকতা]

আসছে ঈদুল ফেতর। প্রতি বছরের মত এবারও বিরাট সামিয়ানা টানিয়ে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে, ব্যাপক খানা-পিনার আয়োজন হবে, ধর্মজীবীদের ঈদ-বাণিজ্য হবে। প্রতিবছরই আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যানকারী নামধারী মোসলেমরা মহা-ধুমধাম কোরে ঈদের নতুন পোশাক কেনে, অনেকে বিদেশে গিয়েও কেনা কাটা করে, তারপর ঈদের নামাজ পড়ে কোলাকুলি করে, লোকদেখানো ভ্রাতৃত্ব প্রদর্শন করে। বাস্তব জীবনে এদের হানাহানি, খুনোখুনিতে জনজীবন বিপর্যস্ত, মানুষ থাকে ভীত, আতঙ্কগ্রস্ত। এই জাতির ঈদ তাই কেবলই আনুষ্ঠানিকতা। কবি নজরুল তাঁর এই বিখ্যাত গানে প্রকৃত মো’মেনদের ঈদ কেমন হওয়া উচিৎ তা ফুটিয়ে তুলেছেন। এ গানে তিনি বর্তমান দুনিয়ার মোসলেমদের “মুর্দা মুসলিম” বোলেছেন। আজ আটলান্টিকের তীর থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত অর্ধ পৃথিবীতে মরা লাশের মতো পড়ে আছে তওহীদহীন, জেহাদহীন অর্থাৎ প্রাণহীন, রক্তচলাচলহীন একটা মৃত এসলাম ও মৃত মোসলেম জাতি। এই মুর্দাদের কালনিদ্রা ভাঙানোর জন্য নিজের জীবন এবং সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়াকে কবি “আসমানী তাকিদ” বোলে আখ্যায়িত কোরেছেন। সত্যিই তাই। নিজের জীবন ও সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে উজাড় কোরে দিতে পারলেই আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা মোতাবেক একজন প্রকৃত মো’মেন হওয়া যাবে। আল্লাহ বলেন, “মো’মেন শুধু মাত্র তারা, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনার পর আর কোন সন্দেহ পোষণ করে না এবং জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ মো’মেন (সুরা হুজরাত- ১৫)”।

আল্লাহর এই সংজ্ঞার আলোকে এই জাতি মো’মেন নয়, মোসলেম নয়, এরা ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতার গোলাম, দাস। জাতিগতভাবেই এরা মরা, প্রাণহীন। কেবল দাসই নয়, তারা সর্বত্র লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। যে জাতি সারা দুনিয়াতে অন্যান্য জাতিগুলির মার খাচ্ছে, উদ্বাস্তু শিবিরে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, যে জাতির নারীরা ধর্ষিত হোচ্ছে, সেই জাতির সদস্য হোয়ে অন্যরা কী কোরে ঈদের দিন এত আনন্দ-ফুর্তি, খাওয়া-দাওয়া করে, এটা আসলেই এক বিরাট জিজ্ঞাসা? তারা কি ভুলে গেছে যে, দাস জাতির জন্য ঈদ নয়? মহানবী (দ:) যখন মক্কায় ছিলেন কেউ বোলতে পারবে যে সেখানে নবী বা তাঁর সাহাবীরা ঈদ আনন্দ কোরেছেন, হজ্ব, কোরবানী, জুম’আ কোরেছেন? কেউ দেখাতে পারবেন না। কারণ তখন তিনি ও তাঁর আসহাবরা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীন ছিলেন না। তারা স্বাধীন ছিলেন না, উপরন্তু তাদের উপর চোলত কাফের-মোশরেকদের নির্যাতন, নিপীড়ন এবং দেশ থেকে উচ্ছেদ-করণ। মদীনায় হেজরতের পর যখন সেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কায়েম হোল, শেরক-কুফরের মূলোৎপাটিত হোল, আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠিত হোল, তখন মোসলেমরা স্বাধীন হোলেন। এ জাতিটিও নামে বিভিন্ন ভূখণ্ডে স্বাধীন কিন্তু বাস্তবে তারা পশ্চিমা জাতিগুলির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক গোলামী অব্যাহতভাবে কোরে যাচ্ছে। প্রকৃত অর্থে তারা স্বাধীন নয়।
এই গোলাম জাতির মধ্য থেকেই যারা তওহীদের শপথ নেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে উৎসর্গ কোরবে তাদের ঈদের নামাজ কবির ভাষায় (শহীদী ঈদ) বর্তমানের ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ, কাফের, পুণ্য-পিশাচ, স্বার্থপর, ভন্ড, মোনাফেক, বে-দীন, খোদার খাসী, বেঈমান, মেষ, ভীরু দুর্বল, জুতো-বওয়া জাতি, পশুর চেয়ে অধম, হীন, ভণ্ড, কপট মোসলেমদের মতো হবে না। উম্মতে মোহাম্মদী জাতিকে আল্লাহ মানবজাতির জন্য শাসক হিসাবে পাঠিয়েছে, তাদের কাজ হোচ্ছে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দান। সেই উম্মতে মোহম্মদী আল্লাহর বিধান না মেনে অন্য জাতির হুকুমের গোলাম হোয়ে, মানুষকে প্রভু হিসাবে মেনে জীবন কাটাবে আর নির্লজ্জের মত প্রতিবছর ঈদ কোরবে এটা হোতে পারে না। তাদের ঈদ হবে সেই মাঠে যে মাঠ গাজী ও শহীদের পূণ্য রক্তে পবিত্র হোয়েছে।
আজ এই জাতির আলেম, মোল্লা, পীর, আউলিয়া নামের ধর্মব্যবসায়ীরা মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা আর আস্তানায় আসন গেঁড়েছে। অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতদের মতো ধর্মকে জীবন জীবিকার মাধ্যমে পরিণত কোরেছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য শিয়া, সুন্নী, শাফেয়ী, হানাফী, হাম্বলী ইত্যাদি হাজারও মত, পথ, মাজহাব, তরিকায় ছিন্ন ভিন্ন কোরে জাতিকে ঐক্যহীন, নির্জীব, নি®প্রাণ কোরে দিয়েছে। ধর্মভীরু বোলে পরিচিত বৃহত্তর জনতাকে প্রতারক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইহুদী খ্রিস্টানদের নকল করা বিভিন্ন তন্ত্রমন্ত্রের আদর্শ দিয়ে হাজারও রকমের রাজনৈতিক দলে বিভক্ত কোরে ঐক্যহীন কোরে, দাঙ্গা, ফাসাদ, রক্তারক্তিতে লাগিয়ে রেখেছে। তারা দাজ্জালের, তাগুতের মুরিদ হোয়ে আল্লাহর মসজিদে সেজদা কোরছে। তাদের এই সেজদা বৃথা। কবি বোলছেন, এই অবস্থায় নিজেদের অন্তর্কোন্দল হানাহানি, দুশমনি ভুলে হাতে হাত মিলিয়ে বিশ্ব নিখিলকে ‘এসলামের মুরিদ’ এ পরিণত করার দায়িত্ব এই জাতির।
দুঃখ লাগে, এই জাতির আগে চিন্তা করা উচিত ছিল যে, আল্লাহর হুকুম বাদ দেওয়ায় আমরা তো মোসলেমই না, মো’মেনই না আমাদের আবার কিসের ঈদ, কিসের কোরবানী, আগে তো মো’মেন হবো তার পরেই না ঈদের আনন্দ। কবি আরেক কবিতায় এই জাতিকে উদ্দেশ্য কোরে বোলেছেন,
ওরে ফাঁকিবাজ, ফেরেব-বাজ,
আপনারে আর দিস্নে লাজ,-
গরু ঘুষ দিয়ে চাস্ সওয়াব?
যদিই রে তুই গরুর সাথ
পার হয়ে যাস পুল্সেরাত,
কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব।

প্রসঙ্গ কথা: এস.এম.সামসুল হুদা,

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ