ধর্ম কি শুধুই পরকালীন মুক্তির ব্যাপার?

মোহাম্মদ আসাদ আলী
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, ‘ধর্ম শুধু পরকালীন মুক্তির ব্যাপার। কাজেই রাষ্ট্র, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইন-আদালত, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদির সাথে ধর্মকে মেশানো যাবে না। রাষ্ট্র চলবে রাষ্ট্রের মতন, ধর্ম থাকবে ধর্মের মতন।’ এই অযৌক্তিক মতবাদটি ধর্মকে পৃথিবী থেকে বিদেয় জানিয়ে পরকালে পাঠিয়ে দিয়েছে মরা মানুষের জন্য। আর জীবিত সমাজকে ছেড়ে দিয়েছে অত্যাচারী অপশক্তির হাতে। ধরে নেওয়া হয়েছে ইহকাল শয়তানের আর পরকাল আল্লাহর। আর যেহেতু ইহকাল বা দুনিয়া শয়তানের, সুতরাং যা কিছু পার্থিব তা-ই পরিত্যাজ্য।
এই বিকৃত ধারণার পরিণতি হয়েছে অতি ভয়াবহ। মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যারা ইহকালে ভালো থাকতে চায় তাদের কাছে পরকালসর্বস্ব ধর্মের আবেদন হারিয়ে গেল। তারা লাগামহীন ভোগ-বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিল, ন্যায় অন্যায়, বৈধ-অবৈধ ইত্যাদি দেখার প্রয়োজনবোধ করল না। আর যারা পরকালে ভালো থাকতে চায় তারা পার্থিব সমস্তকিছু থেকে যতটা সম্ভব নিজেদেরকে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা চালাতে লাগল। দুনিয়ায় কী ঘটছে, কার সম্পদ কে লুটে নিচ্ছে, কে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কে ধর্ষিতা হচ্ছে, কে খুন হচ্ছে, কে শোষিত হচ্ছে ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজনই বোধ করল না। পরকালীন নাজাতের উদ্দেশ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, হুজরা, দরগা, মাজারে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। দু’পক্ষই ভারসাম্য হারিয়ে দু’দিকে ঝুঁকে পড়ল। এই যে বিভক্তি- এই বিভক্তি আমাদের জাতীয় ও সামাজিক ঐক্যের পথে শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দ্বিমুখী- পার্থিব ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা,
আমাদের জ্ঞানচর্চা দু’ধরনের- পার্থিব জ্ঞান ও ধর্মীয় জ্ঞান,
আমাদের রাজনীতি দুই ধারার- ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মভিত্তিক,
আমাদের দৃষ্টিকোণ পৃথক- প্রচলিত দৃষ্টিকোণ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ,
আমাদের পোশাক ভিন্ন- সাধারণ পোশাক ও ধর্মীয় পোশাক,
আমাদের সংস্কৃতি আলাদা- আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সংস্কৃতি,
আমাদের দান/খয়রাত দুই পথে- সামাজিক উন্নয়নে পার্থিব অনুদান এবং মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে কথিত আল্লাহর রাস্তায় দান।
এই বিভক্তির তালিকার শেষ নেই।
হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, ধর্মকে ‘বাস্তব দুনিয়া’ থেকে নির্বাসন দেয়ার পরও অনেকে প্রশ্ন করেন, আল্লাহ কেন দুনিয়ার এত অন্যায়-অত্যাচার দেখেন না, অত্যাচারীদের শাস্তি দেন না। তারা বোঝেন না আল্লাহ দুনিয়ার সমস্যা সমাধানের জন্যই ধর্ম পাঠিয়েছিলেন, আমরা সেটাকে পরকালে নির্বাসন দিয়ে রেখেছি। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আমাদের পছন্দ হয় নাই বলে রাস্তায় ফেলে দিয়েছি, তারপর রোগী মারা গেলে ডাক্তারকে দোষারোপ করার সুযোগ আছে কি?
মোহাম্মদ আসাদ আলী: কলাম লেখক। (facebook/asadali.ht)

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ