ধর্মব্যবসা ভোগ করা শেখায়, কিন্তু জান্নাত ত্যাগের মধ্যে

রিয়াদুল হাসান:
ধর্মব্যবসা মানুষকে সুবিধা গ্রহণ করতে শেখায়, কিন্তু আল্লাহ চান মানুষ আত্মত্যাগ করুক, অপরকে দিয়ে পরিশুদ্ধি অর্জন করুক। জান্নাতের জন্য ত্যাগস্বীকার করতে হয়। আল্লাহ কোর’আনে সমগ্র মানবজাতির জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। এই জীবনব্যবস্থার অন্যতম নীতি হলো দান করা, ব্যয় করা যার মাধ্যমে সমাজ থেকে অর্থনৈতিক অবিচার, বৈষম্য বিদূরিত হয়ে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সম্পদ কোথাও পুঞ্জিভ‚ত হবে না। ফলে সমাজের প্রত্যেকের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত হবে। সত্যদীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন ও সম্পদ উভয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর যেহেতু উম্মতে মোহাম্মদীর জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করা, তাই মো’মেনের সংজ্ঞার মধ্যেই আল্লাহ সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে সংগ্রাম করাকে অঙ্গীভ‚ত করে দিয়েছেন (সুরা হুজরাত ১৫)। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ উৎসর্গ করা কেবল ইসলামের একটি আমল নয়, এটি মো’মেন হওয়ার অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, একত্ব অর্থাৎ তওহীদের পরে পবিত্র কোর’আনে বিভিন্ন উপায়ে সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশই সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হয়েছে। পবিত্র কোর’আনে অন্তত ২২টি খাতে সম্পদ দান করার নির্দেশ পাওয়া যায়।
জান্নাত শুধুমাত্র কান্নাকাটি করে, দোয়া করে পাওয়ার বিষয় নয়। এটি আল্লাহর সঙ্গে মো’মেনের একটি কেনাবেচা, বাণিজ্য বা লেনদেনের বিষয়। মো’মেন নিজের জীবন ও সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, মানবতার কল্যাণে ব্যয় করবে, বিনিময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাত দেবেন। তবে কি মো’মেন আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করবে না? হ্যাঁ, অবশ্যই কান্নাকাটি করে আকুলভাবে চাইবে যেন সে তার জীবন ও সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে পারে। সে যদি স্বার্থপরের মতো জীবনযাপন করে, আল্লাহর রাস্তায় জীবন-সম্পদ ব্যয় না করে তাহলে তাকে আল্লাহ জান্নাত দিবেন না। আল্লাহ অন্তত দুটো আয়াতে এই সাফ কথাটি জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে মো’মেনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম; যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন উদ্যানে যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত এবং এমন উৎকৃষ্ট বাসগৃহে যা স্থায়ী জান্নাতে অবস্থিত। এটা মহাসাফল্য (সুরা সফ – ১২)।
অন্যত্র তিনি আরো সুস্পষ্টভাবে এই কেনাবেচার কথাটি উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মো’মেনদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা সংগ্রাম করে আল্লাহর রাস্তায়, (যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) হত্যা করে এবং নিহত হয়। সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেনদেনের উপর, যা তোমরা করেছ তাঁর সাথে। আর এ হলো মহান সাফল্য (সুরা তাওবা ১১১)। এ বিষয়ে আল্লাহর চ‚ড়ান্ত ঘোষণা হচ্ছে, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো।” (সুরা ইমরান ৯২)।
সুতরাং এটা সুস্পষ্ট যে ভোগ করার মধ্যে জান্নাত নেই, স্বার্থপরের জন্য জান্নাত নেই, জান্নাত হচ্ছে ত্যাগের মধ্যে। মানুষ যখন অন্যকে দিতে শেখে তখন একদিকে সে নিজে পরিশুদ্ধ হয়, অপরদিকে তার জাতি সমৃদ্ধ হয়। আর যদি সবাই ভোগের পেছনে ছোটে তাহলে সকলেই আত্মকেন্দ্রিক হবে, স্বার্থপর হবে। আজকে এটাই হয়েছে। তখন বিপুল সম্পদ থাকলেও তাতে টান পড়বে। সম্পদ এক জায়গায় পুঞ্জিভ‚ত হয়ে যাবে। স্বভাবতই ধর্মের কোনো কাজ করার ক্ষেত্রেই বিনিময় বা লেনদেনের কোনো সুযোগ নাই। যারা ধর্মের কাজের বিনিময় নেবে তার জন্য কোনো জান্নাত নাই। আজকের পৃথিবীটা স্বার্থকেন্দ্রিক। ধর্মের অঙ্গনটি এককালে নিঃস্বার্থ ছিল। মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধর্ম প্রচার করত, দীনের কাজ করত। এখন যারা ধর্মের ধারকবাহক তারা টাকা ছাড়া একটি কাজও করেন না। নামাজ পড়াবেন – তাতেও টাকা, অন্যের জন্য দোয়া করবেন- তাতেও টাকা, সমাজের কেউ মারা গেছেন, জানাজা পড়াবেন, দাফন করবেন – তাতেও টাকা। ধর্মব্যবসার চিত্র এখন বিকৃতির চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। যারা তাদেরকে দিচ্ছেন তারা সওয়াব মনে করে দিচ্ছেন, যারা খাচ্ছেন তারা অধিকার মনে করে খাচ্ছেন। বহু জায়গায় এই লেনদেন নিয়ে মারামারি, খুনোখুনী পর্যন্ত হওয়ার খবর আছে।
আজকের বৈশ্বিক ভয়াবহ সঙ্কটে মুসলিম দাবিদার জনগোষ্ঠীটি নিপতিত। এ থেকে উদ্ধার পেতে হলে ধর্মব্যবসার বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হবে। এছাড়া ধর্মের অনাবিল রূপ, প্রকৃত রূপ মানুষ কোনোদিন দেখতে পাবে না। ধর্মব্যবসায়ীরা সেটা প্রকাশিত হতেই দেবে না। ধর্মব্যবসার বিষয়ে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখন আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য হওয়া উচিত।
[কলামিস্ট: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি, ইমেইল: mdriazulhsn@gmail.com]]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ