ধর্মব্যবসায়ীরা যখন দুরাচারী শাসকের তাবেদার

রিয়াদুল হাসান
আজ থেকে ১৩শ’ বছর আগে উম্মতে মোহাম্মদী যখন তার দায়িত্ব থেকে বিমুখ হলো, বিশ্বময় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ করল তখন অর্ধেক দুনিয়ার সম্পদ এই জাতির পায়ের নিচে। এই বিপুল সম্পদরাশি হাতে পেয়ে জাতির অযোগ্য নেতারা ভোগবিলাসে মত্ত হলো। এটা সমস্ত মুসলিম বিশ্বে গৃহীত হয়ে গেল যে আমির বলতে ধনকুবের বোঝানো হয়। বাংলা ভাষায় আমির-ফকির শব্দ দু’টো দিয়ে ধনী ও গরিবকে নির্দেশ করা হয়। অথচ প্রকৃত ইসলামের যুগে আমির বলতে প্রশাসক, নেতা, আদেশদাতা বা সেনাবাহিনীর কমান্ডারদেরকে বোঝানো হতো যা কোনোভাবেই ধনীর সমার্থক নয়। আজও আমির বলতে ধনীদেরকে বোঝানো হয়। জাতির নেতারা জাতির সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করল। পৃথিবীর অপরাপর রাজা বাদশাহদের মতই তারা সর্বরকম পাপাচারে লিপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু বৃহত্তর মুসলিম জনতা যেন খলিফা নামধারী সুলতানদের বিরুদ্ধে না চলে যায় সেজন্য সুলতানদের প্রয়োজন হয় কিছু ভাড়াটিয়া আলেমের যারা পদ ও সম্পদের লোভে শাসকদের যাবতীয় অনাচারকে কোর’আন সুন্নাহর মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে এবং জনগণকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল শেখাবে। রাজা বাদশাহরা যা কিছুই বলবে কোর’আন ও হাদিসকে অপব্যাখ্যা করে সেটাকে ইসলাম সম্মত করার চেষ্টা করবে।
তখন এই জাতির মধ্যে একদল অর্থলোভী আলেম, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির জন্ম হলো। উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য এরা লক্ষ লক্ষ জাল হাদিস রচনা করল। এই গোষ্ঠীটিকে ইসলামের ব্যাখ্যাকার ঐতিহাসিকগণ আলিমুস সুলতান বা সরকারি আলেম, দরবারী আলেম, দুনিয়াদার আলেম, ওলামায়ে ছুঁ, নিকৃষ্ট আলেম ইত্যাদি অপমানজনক নামে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহর রসুল তাঁর বহু ভবিষ্যদ্বাণীতে এই বিশেষ ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীটির ব্যাপারে উম্মাহকে সাবধান করে গেছেন। কেননা আলেমদের দায়িত্ব হচ্ছে ন্যায় ও অন্যায়কে পৃথক করে দেওয়া, অথচ এই আলেমগণ শাসকদের ‘অন্যায়’ কাজকে ‘ন্যায়’ বলে ফতোয়া প্রদান করেছে। যার ফলে তাদের লাগামহীন ইন্দ্রিয়পূজা, অপচয়, ব্যভিচার, সম্পদ লুণ্ঠন ন্যায়সঙ্গত হয়ে গেছে এবং উত্তরোত্তর প্রসার লাভ করেছে। তারা ভুলে গিয়েছিল আল্লাহর সাবধানবাণী, “যখন আমি কোনো এলাকাকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন উক্ত এলাকার ধনীদের সুযোগ করে দেই ফলে তারা অবাধ্য হয় তখন আমি উক্ত এলাকাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেই” ( আল কোর’আন: সুরা বনী ইসরাইল ১৬)।
সাধারণ জনগণ যখন নেতৃত্বস্থানীয়দেরকে স্পষ্ট পাপাচারে লিপ্ত দেখে তখন তাদের অনুসরণে তারাও উক্ত পাপের প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। এভাবে সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিদের পিছনে জীবন ক্ষয় করে যখন হাশরের দিন অপমানিত অবস্থায় উত্থিত হবে তখন মানুষ আফসোস করে বলবে, “হে আমাদের রব, আমরা তো আমাদের নেতা নেত্রী ও উঁচুতলার ব্যক্তিদের অনুসরণ করে চলতাম। ফলে তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করে ছেড়েছে। তুমি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দাও, তাদের তুমি চরমভাবে অভিশপ্ত করো” (আল কোর’আন: সুরা আহযাব ৬৭-৬৮) কিন্তু তখন এই আফসোস কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ বলবেন, “প্রত্যেকের শাস্তিই দ্বিগুণ করা হলো। তোমরা ভীষণ অজ্ঞ” (আল কোর’আন: সুরা আরাফ ৩৮)
শাসক যখন পথভ্রষ্ট হয় তখন অপরাধ কোনো গ-িতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে নিজে অপরাধ করে, অন্যকে অপরাধ করতে উৎসাহিত করে, আইন করে অন্যায় কর্মের অনুমোদন প্রদান করে, মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য হতে বাধ্য করে। আর এই অনুমোদনের কাজটি করে দেয় দরবারী আলেমগণ। আমাদের সমাজে এই গোষ্ঠীটি এখনও বেশ প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। ধর্ম যেহেতু বর্তমান পৃথিবীর প্রধান ইস্যু তাই মুসলিম নামধারী শাসকবর্গ এই ভাড়াটিয়া আলেমদেরকে যখন যেখানে দরকার পড়ে ব্যবহার করেন। রসুলাল্লাহ (সা.) ১৪শ’ বছর আগেই এর ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার উম্মতের একটি দল দীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করবে, কোর’আন পাঠ করবে, তারপর তারা বলবে, আমরা নেতৃবর্গের নিকট যাব, তাদের নিকট হতে দুনিয়ার সম্পদ গ্রহণ করবো কিন্তু দীনের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করব না। এরূপ কখনো হতে পারে না। যেমন কাঁটাদার গাছ থেকে ফল আহরণের সময় হাতে কাঁটা ফুটবেই, তদ্রƒপ তারা তাদের কাছে গিয়ে গুনাহ ব্যতীত তারা কিছুই লাভ করতে পারে না” (হাদিস: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে ইবনে মাজাহ, মেশকাত, কানযুল উম্মাল, সুয়ুতী, তারগীব ওয়াত তারহীব)।
বস্তুত যেদিন থেকে ধর্মের ধ্বজাধারীদেরকে টাকা দিয়ে কেনা যায় সেদিন থেকেই ধর্ম বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এখন পড়ে আছে কেবল ধর্মের খোলস। কিন্তু দুনিয়ার পদ ও পদবীর বিনিময়ে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলতে এদের নিষেধ করা হয়েছিল। আল্লাহ বলেছেন, “তারপর (নেককারদের পর) কিছু লোক কেতাবের ওয়ারিস হলো (কেতাবের জ্ঞানপ্রাপ্ত হলো) কিন্তু তারা (বিনিময় বা ঘুষ হিসাবে) দুনিয়ার এই নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করত এবং বলত আমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। পরে যদি আবার অনুরূপ বস্তু পেশ করা হয় তারা আবার গ্রহণ করে। তাদের নিকট কি এই ওয়াদা নেওয়া হয় নি যে আল্লাহর ব্যাপারে তারা মিথ্যা কথা বলবে না? আর কিতাবে যা আছে তারা তো তাও পাঠ করেছে। নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্য আখেরাতই উত্তম, তোমরা কি বোঝো না?” (আল কোর’আন: সুরা আরাফ ১৬৯)।
মুসলিমরা ইউরোপিয়ানদের গোলাম হওয়ার আগে ধর্মব্যবসায়ী দরবারী আলেমরা যে ফতোয়া দিতেন সেগুলোই মুসলিম অধ্যুষিত ভূখ-গুলোতে প্রয়োগ করা হতো, সেগুলোই ফতোয়ার বইতে গ্রন্থিত হতো। যেমন মোগল বাদশাহ আলমগীরের (আওরঙ্গজেব) নির্দেশে দরবারী আলেমগণ যে ফতোয়ার বইটি গ্রন্থিত করেন তার নাম ফতোয়ায়ে আলমগীরী যা কেবল এই উপমহাদেশের জীবনব্যবস্থাকেই নিয়ন্ত্রণ করত না, তুরস্কের অটোমান সা¤্রাজ্যেও এই ফতোয়াগুলোই কার্যকর করা হতো। আমরা জুমার সময় প্রাচীন যুগের যে খোতবাগুলো পাঠ করতে শুনি তার মধ্যে রসুলাল্লাহর (সা.) নামে একটি জাল হাদিসও আমাদেরকে শুনতে হয়, সেটা হচ্ছে, “আস সুলতানু জিল্লুল্লাহে ফিল আরদ অর্থাৎ সুলতান হচ্ছেন জমিনে আল্লাহর ছায়া” (হাদিস: আবু হোরায়রাহ (রা.) থেকে আল বাজ্জার, বায়হাকি, তাবারানি)। অথচ ইসলামে সালতানাত বা রাজতন্ত্রই নিষিদ্ধ এবং রসুল বা তাঁর সাহাবীরা কেউ সুলতান ছিলেন না। এগুলোই হচ্ছে সরকারি আলেমদের দীনি খেদমত আর অবদান যার বোঝা আমরা আজও বহন করে যাচ্ছি। তাদের রচিত নিয়ম-কানুন, হালাল-হারামের ফতোয়াগুলোই আমরা ধ্রুব সত্য বলে মনে করছি এবং সেই বিকৃত ইসলামটিকেই প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিভিন্ন ইসলামি দল খেয়ে না খেয়ে কথিত জেহাদ করে যাচ্ছে। এদের বিষয়ে আল্লাহর রসুলের কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করছি:
রসুলাল্লাহর খাদেম সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি রসুলাল্লাহ (সা.) কে বললেন, আমি কি আপনার পরিবারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত? রসুলাল্লাহ (সা.) চুপ থাকলেন। এভাবে তিনবার প্রশ্ন করার পর তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যদি তুমি কোনো নেতার দরজাতে ধর্ণা না দাও এবং কোনো নেতার নিকট যেয়ে কিছু না চাও” (হাদিস: তারগীব ওয়াত তারহীব)।
রসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যারা মরু অঞ্চলে বসবাস করে তারা রুক্ষতা প্রাপ্ত হয়, যারা জীবজন্তু শিকার করে তারা বেপরোয়া হয় এবং যে ব্যক্তি শাসকের (সুলতান) দরবারে যাওয়া আসা করে সে ফিতনায় পড়ে যায়। যে কেউ শাসকের নিকটতর হয় সে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়” (হাদিস: ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আবু দাউদ, তিরমিজি, মেশকাত, তারগীব ওয়াত তারহীব)।
রসুলাল্লাহ বলেছেন, “শাসকদের দরজা থেকে সতর্ক থেক কারণ সেগুলো ফেতনা, হয়রানি ও অবমাননার উৎস হয়ে দাঁড়ায়” (হাদিস: আবু আল আওয়ার আস-সিলমি (রা.) থেকে শহীদ আদ-দায়লামি, ইবনে মুনদাহ, ইবনে আসাকি)।
রসুলাল্লাহ বলেছেন যে, “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হলো আলিমুস সুলতান বা সরকারি আলেম” (হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) থেকে জামিউল আহাদিস: কানযুল উম্মাল)।
আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলাল্লাহ বলেছেন যে, “আল্লাহর কাছ থেকে দুর্দশার গহ্বর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো।” সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! দুর্দশার গহ্বর কী?” তিনি উত্তর দিলেন, “এটি হচ্ছে জাহান্নামের একটি নদী যা থেকে খোদ জাহান্নাম প্রতিদিন শতবার আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।” সাহাবিরা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! এতে কে প্রবেশ করবে?” তিনি বললেন, “এটি প্রস্তুত করা হয়েছে পবিত্র কোর’আনের সেই ক্বারীদের জন্য যারা নিজেদের আমলকে প্রদর্শন করতে আগ্রহী। আর আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ক্বারী হচ্ছে তারা যারা শাসকদের দরবারে যাতায়াত করে” (হাদিস: ইবনে মাজাহ)।
রসুলাল্লাহ বলেছেন, “যদি তুমি কোনো আলেমকে দেখ যে শাসকদের (সুলতান, আমির-ওমরাহ) সাথে খুব মেলামেশা করছে, তাহলে জেনে রেখ যে সেই লোক একটা চোর”(হাদিস: দায়লামী, মুসনাদে ফেরদাউস)
ইমাম আবু হানিফা (র.) বলেছেন, “যদি তুমি কোনো আলেমকে নিয়মিতভাবে খলিফার দরবারে যাতায়াত করতে দেখ তাহলে তার দীন ত্রুটিযুক্ত বলে জানবে।” তাঁর সময়ে যিনি খলিফা ছিলেন তিনি তাঁকে প্রধান বিচারপতি বা কাজির দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার দরুন সাজাপ্রাপ্তও হয়েছিলেন।
রসুলাল্লাহ বলেছেন, “ফকীহগণ (শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ) হচ্ছেন নবীদের প্রতিনিধি (ন্যায়পাল) যতদিন না তারা দুনিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে অথবা শাসকদের অনুগামী হয়। যদি তারা সেটা করে তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকবে” (হাদিস: আলী (রা.) থেকে ইমাম আসকারী)।
রসুলাল্লাহ বলেছেন, “যখন কোনো আলেম স্বেচ্ছায় কোনো শাসকের কাছে গমন করেন তখন তিনি সেই শাসকের প্রত্যেক অন্যায় কাজের অংশীদার হবেন এবং ঐ শাসকের সাথেই জাহান্নামের আগুনে সাজাপ্রাপ্ত হবেন” (হাদিস: মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে হাকিম, দায়লামি)।
প্রশ্ন আসতে পারে, এই হাদিসগুলোতে কোন শাসকের কথা বলা হয়েছে। কারণ আবু বকর (রা.), ওমর (রা.) – এঁরাও তো শাসকই ছিলেন। তবে এখানে সেই সত্যনিষ্ঠ ন্যায় পরায়ণ শাসকদের কথা বলা হয় নি। বরং বলা হয়েছে স্বার্থবাদী, অবিচারী, জালেম শাসকদের কথা। খোলাফায়ে রাশেদিনের পরবর্তী যুগে উম্মাহর নেতৃত্বে থাকা এ ধরনের জালেম শাসকদের দ্বারাই ইসলাম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ইসলামের বদনাম হয়েছে। এহেন শাসক ও ক্ষমতাসীনদের তাবেদার যে ধর্মব্যবসায়ী আলেম, তাদের সম্পর্কে এমন আরো বহু হাদিসে রসুল, তাঁর সাহাবিদের সতর্কবাণী ও প্রাথমিক যুগের প্রসিদ্ধ ইমামদের বহু হুঁশিয়ারি বার্তা এখানে উল্লেখ করা যেত, কিন্তু পুনরুক্তি এড়ানোর স্বার্থে এখানেই থামছি। ক্ষমতাবান শাসক, আমির, সুলতান, বাদশাহদের মন যোগাতে গিয়ে ধর্মব্যবসায়ী আলেমরা কেমন করে জাল হাদিস রচনা করেছেন তার বর্ণনা দিয়ে তৃতীয় হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস যুহাইর ইবনু হারব (২৩৪ হি) বলেন: তৃতীয় আব্বাসীয় খলিফা মুহাম্মাদ মাহ্দী (শাসনকাল ১৫৮-১৬৯ হি) এর দরবারে একবার কয়েকজন মুহাদ্দিস আগমন করেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন গিয়াস ইবনু ইবরাহীম আন-নাখয়ী। খলিফা মাহ্দী উন্নত জাতের কবুতর উড়াতে ও কবুতরের প্রতিযোগিতা করাতে ভালবাসতেন। খলিফার পছন্দের দিকে লক্ষ্য করে গিয়াস নামক এই ব্যক্তি একেবারে তথ্যসূত্র (সনদ, Chain) উল্লেখ করে বলেন, রসুলাল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তীর নিক্ষেপ, ঘোড়া ও পাখি ছাড়া আর কিছুতে প্রতিযোগিতা নেই।’ একথা শুনে মাহদী খুশী হন এবং উক্ত মুহাদ্দিসকে ১০ হাজার মুদ্রা হাদিয়া প্রদানের নির্দেশ দেন। কিন্তু যখন গিয়াস দরবার ত্যাগ করছিলেন তখন মাহদী বলেন, “আমি বুঝতে পারছি যে, আপনি মিথ্যা বলেছেন। আর আমিই আপনাকে মিথ্যা বলতে প্ররোচিত করেছি।” এরপর তিনি কবুতরগুলো জবাই করতে নির্দেশ দেন। তিনি আর কখনো উক্ত মুহাদ্দিসকে তার দরবারে প্রবেশ করতে দেন নি” (ইমাম মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী, যয়ীফু সুনানি ইবনি মাজাহ (রিয়াদ, মাকতাবাতুল মা’আরিফ, ১ম প্র, ১৯৯৭)।
এখানে লক্ষণীয় যে, মূল হাদিসটি সহীহ, যাতে ঘোড়দৌড়, উটদৌড় ও তীর নিক্ষেপে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রদানে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যক্তি খলিফার মনোরঞ্জনের জন্য সেখানে ‘পাখি’ শব্দটি যোগ করেছে।
পঞ্চম আব্বাসী খলিফা হারূন আর-রশীদ (শাসনকাল ১৯৩-১৭০ হি) রাষ্ট্রীয় সফরে মদীনা আগমন করেন। তিনি মসজিদে নববীর মিম্বরে উঠে বক্তৃতা প্রদানের ইচ্ছা করেন। তাঁর পরনে ছিল কালো শেরোয়ানী। তিনি এই পোশাকে মিম্বরে নববীতে আরোহণ করতে দ্বিধা করছিলেন। মদীনার সুপরিচিত আলেম ও কাজী ওয়াহাব ইবনে ওয়াহাব আবুল বুখতুরী তখন বলেন: আমাকে ইমাম জা’ফর সাদিক বলেছেন, তাঁকে তাঁর পিতা মুহাম্মাদ আল-বাকির বলেছেন, জিবরাঈল কালো শেরোয়ানী পরিধান করে রসুলাল্লাহ (সা.) এর নিকট আগমন করেন” (ইমাম মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ (রিয়াদ, মাকতাবাতুল মাআরিফ, ১ম প্রকাশ)।
এভাবে তিনি খলিফার মনোরঞ্জনের জন্য একটি মিথ্যা কথাকে হাদিস বলে চালালেন। আবুল বুখতুরী হাদিস জালিয়াতিতে খুবই পারদর্শী ছিলেন।
ওয়াজের মধ্যে শ্রোতাদের দৃষ্টি-আকর্ষণ, মনোরঞ্জন, তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার ও নিজের সুনাম, সুখ্যাতি ও নগদ উপার্জন বৃদ্ধির জন্য অনেক মানুষ ওয়াজের মধ্যে বানোয়াট কথা হাদিস নামে বলেন। এর প্রচলন বহু পূর্বে থেকেই হয়ে আসছে। মিথ্যা ও জাল হাদিসের প্রসারে এসকল ওয়াজকারী গল্পকারদের ভূমিকা ছিল খুব বড়। জাল হাদিসগুলো কেন, কারা, কী উদ্দেশ্যে, কীভাবে রচনা করেছিল তা নিয়ে সহ¯্রাধিক বছর থেকে বড় বড় কেতাব লেখা হয়েছে, আগ্রহী পাঠকগণ সেগুলো পড়লে আল্লাহ-রসুলের নামে ধর্মব্যবসায়ীদের মিথ্যাচারের দুঃসাহস দেখে বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। এখানে সেই আলোচনায় যাব না, শুধু এটুকুই বলছি, দীনের এই বিকৃতিসাধনের ধ্বংসাত্মক ফল হয়েছিল এই যে, গোটা জাতি যাদেরকে আল্লাহর রসুল একটি ইসপাত কঠিন ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখে গিয়েছিলেন তারা ঐ সব হাদিসের ব্যাখ্যা নিয়ে, মাসলা মাসায়েল বের করে শত সহ¯্র ফেরকায় বিভক্ত হয়ে গেল। মুসলিম জাতি আর একক জাতি রইল না, তাদের নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে গেল, তাদের বিশ্বাস বিভক্ত হয়ে গেল। এইসব ক্ষুদ্র ও বৃহৎ মাজহাব ফেরকা-তরিকার অনুসারীরা ঐ সব মাসলা মাসায়েল নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে বাহাস, তর্ক শুরু করল। সেই তর্ক বিতর্ক রক্তারক্তিতে গড়ালো। যে জাতি সৃষ্টি করা হয়েছিল সকল মিথ্যার মস্তকে আঘাত করে সত্যকে বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করতে, সেই জাতির লোকেরা নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (Sectarian war) লিপ্ত হলো। এক দল আরেক দলকে দুনিয়া থেকে মুছে ফেলতে চাইল। জাতি লক্ষ্যচ্যুত হলো, তাদের আকিদা বিকৃত হয়ে গেল, তারা একটি বিশৃঙ্খল, ভীরু-কাপুরুষ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলো। ফলশ্রুতিতে তারা ইউরোপীয় ইহুদি-খ্রিষ্টান ছোট ছোট জাতিগুলোর ক্রীতদাসে পরিণত হলো। এই ইউরোপিয়ানরা তাদেরকে সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও শোষণ করে জুতা সাফ করতে বাধ্য করল। সেই দাসত্ব, গোলামি এখনও চলছে। এভাবেই আজ মুসলিম জনগোষ্ঠী হাজারো ফেরকায় বিভক্ত হয়ে সেই পূর্বতন প্রভুদের পদলেহন করেই চলছে। ইরানের নেতৃত্বে শিয়া ব্লক, সৌদী আরবের নেতৃত্বে সুন্নী ব্লক লড়াই করছে। তাদের পরস্পরের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশগুলো। সেখানে ইন্ধন দিচ্ছে ইসরাইল, পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীরা। তারা একে অপরের মসজিদে হামলা করছে, বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটানোর জন্য এই মুহূর্তে শিয়া আর সুন্নী ব্লকের এই বিবাদই যথেষ্ট। এই হচ্ছে ধর্মব্যবসা ও দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ইসলামের বিকৃতি সাধনের নেট ফল।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ