ধর্মব্যবসার একটি ধারা: রাজনৈতিক ইসলাম

রিয়াদুল হাসান
ইসলাম শুধু ব্যক্তিজীবনের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালনের ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বিচারিক, সামরিক ইত্যাদি সকল বিভাগের দিক নির্দেশনা প্রদান করে। আর রাষ্ট্রশক্তি তথা সার্বভৌমত্ব ছাড়া কখনওই একটি জীবনব্যবস্থা একটি জাতির জীবনে কার্যকর করা যায় না এটা সাধারণ জ্ঞান। এই সার্বভৌমত্ব আল্লাহর রসুল যে প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটাই হচ্ছে ইসলামের নীতি ও প্রক্রিয়া। তিনি কী করেছিলেন? তিনি প্রথমে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পক্ষে, তওহীদের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। মানুষকে না বুঝিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বা মানুষকে অন্ধকারে রেখে শাসন ক্ষমতা দখল করে নিয়ে তিনি মদিনার নেতা হন নি। মানুষকে সত্য বোঝানোর জন্য কী অকল্পনীয় ত্যাগ, কোরবানি, সবর তাঁকে করতে হয়েছে তা ইতিহাস। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যখন মদিনার জনগণ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব তথা আল্লাহ হুকুম স্বীকার করে নিল এবং রসুলাল্লাহকে তাদের পরিচালক হিসাবে তাদেরকে শাসন করার এখতিয়ার অর্পণ করল, তখনই রসুলাল্লাহ তাঁদের সর্বোচ্চ নেতা হলেন এবং সেখানে আল্লাহর বিধান দিয়ে তাদেরকে পরিচালিত করতে লাগলেন। ক্রমান্বয়ে পুরোনো সব ব্যবস্থা লুপ্ত হলো, এক নতুন সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হলো। এই নব সভ্যতা কেবল তাদের জাতীয় রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে নয়, তাদের চিন্তাচেতনা, সংস্কৃতির উপরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করল। ঐ নবগঠিত জাতির নিরঙ্কুশ সিদ্ধান্তদাতা ছিলেন রসুলাল্লাহ স্বয়ং। তিনি একাধারে বিচারক ছিলেন; বিচারক হিসাবে তাঁকে অপরাধীকে দণ্ড প্রদান করতে হয়েছে। তিনি সেনাপতি ছিলেন; সেনাপতি হিসাবে তাঁকে সামরিক কলাকৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে সন্ধিচুক্তি, যুদ্ধাভিযান পর্যন্ত করতে হয়েছে। তিনি ঐ জাতির নেতা (এমাম) ছিলেন, তাই নামাজসহ জীবনের প্রতিটি অঙ্গনের নেতৃত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা তাকে প্রদান করতে হয়েছে। আল্লাহর রসুল হিসাবে রেসালাতের বাণী প্রচার করেছেন, আত্মিক, মানসিক, শারীরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সমগ্র পৃথিবীতে সত্যদীন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে উম্মাহ গঠন করেছেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা আর আজকের পৃথিবীতে যে ভৌগোলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছে তার ভিত্তি এক নয়, কাঠামোও এক নয়। ইসলামের ‘নেতা নির্বাচন পদ্ধতি’ আর প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারায় ‘নেতা নির্বাচন পদ্ধতি’ এক নয়। তবু উপায়ন্তর না পেয়ে অথবা হীনম্মন্যতাবশত পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক প্রভুদের শেখানো রাজনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিগত শতাব্দীর অনেক চিন্তাবিদ কিছু রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেগুলোকে ইসলামিক মুভমেন্ট বা ইসলামী আন্দোলন বলা হয়ে থাকে। এগুলো আসলে কী? কয়েকশত বছর আগে বিশ্বের মুসলিম এলাকাগুলো ইউরোপীয় খ্রিষ্টান জাতিগুলোর পদানত হয়। এই দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতেও আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে, এগুলো তারই একটি ধারা, প্রভুদের উদ্ভাবিত রাজনীতিক প্রক্রিয়ায় কয়েকশ বছরের গোলামি থেকে জাতিকে উদ্ধার করে ইসলামী শরিয়াহ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ।
সেই রাজনৈতিক দলগুলো সবই ব্যর্থ হয়ে গেছে অথবা মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অনেক দেশে এই দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। হয় তাদেরকে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয় নি, অথবা যেতে দিলেও কিছুদিন বাদেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বা গণবিক্ষোভের কারণে তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। এক কথায় তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছেন এবং হবেন। এর প্রধান কারণ পশ্চিমা প্রভুরা আসলে ইসলাম চায় না। তাই ইসলামপন্থীদের রাজনীতি করার সুবিধা দিলেও তাদের হাতে কর্তৃত্ব অর্পিত হোক এটা তারা মেনে নিতে পারে না। আর ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু পশ্চিমাদের পদ্ধতি মেনেই রাষ্ট্র পরিচালনার জায়গায় যান, তাই তাদেরকে সেখান থেকে নামিয়ে দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা সেই পাশ্চাত্য প্রভুদের হাতেই রয়ে যায়। এটাকে আর যা-ই হোক সার্বভৌমত্ব বলা যায় না। সার্বভৌমত্বের মানে হচ্ছে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। বস্তুত ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হবেই কারণ আল্লাহ মানুষকে একটি জীবনব্যবস্থা দান করবেন আর সেটা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি মানুষ চিন্তা করে আবিষ্কার করবে এটা হতে পারে না। এই দলগুলোর প্রত্যেকটির কর্মসূচি তাদের নেতারা বসে তৈরি করেছেন, সেগুলো আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি নয়। আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি কোনটি তা আমরা ‘ধর্মব্যবসার উৎপত্তি’ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। সেই হাদিসটির শেষাংশে আল্লাহর রসুল বলেছেন যে, যারা (ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, হেজরত ও জেহাদ) এই পাঁচটি কাজের ঐক্যবন্ধনী থেকে আধ হাতও বহির্গত হবে তাদের গলদেশ থেকে ইসলামের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা জাহেলিয়াতের কোনো কিছুর দিকে আহ্বান করে তাদেরকে জাহান্নামের জ্বালানি পাথরে পরিণত করা হবে যদিও বা তারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে বিশ্বাস করে, সালাহ কায়েম করে, সওম পালন করে (হাদিস: আল হারিস আল আশয়ারী (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাব উল এমারাত, মেশকাত)। ব্রিটিশদের তৈরি করা রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি রসুলাল্লাহর ঘোষণা মোতাবেক জাহেলিয়াতের পদ্ধতি নয় কি?
সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ যুগে দেখে এসেছে যে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। পাশ্চাত্যে পাঁচশ বছর ধরে এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। ব্রিটিশরাও ভারতবর্ষসহ মুসলিম অধ্যুষিত ভূমি দখল করে ইউরোপের সেই ব্যবস্থাই চাপিয়ে দিয়েছিল। এর আগে মুসলিম বিশ্বে ইসলামের নামেই শাসন চলত। খলিফা বা সুলতানদের নামে খোতবা দেওয়া হতো, মুদ্রার উপর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ খচিত থাকত। দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, রাজস্ব, দেওয়ানী, ফৌজদারি ইত্যাদি বিষয়গুলো ইসলামের বিধি-ব্যবস্থা মোতাবেকই চালিত হতো। কাজিরা বিচার করতেন ইসলামের ফেকাহ আর ফতোয়ার কেতাব মোতাবেক। এভাবে সহস্রাধিক বছর ধরে চলেছে এবং মুসলিমরা এরই মধ্যে তাদের সোনালি যুগ অতিক্রম করেছে এবং আদর্শচ্যুত হয়ে পতনের কিনারায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশে যে গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, টাকায় আট মণ চাল ইত্যাদি প্রবাদগুলো চালু আছে তা ঐ মুসলিম শাসনামলেরই ইতিহাস।
মুসলিম শাসকদের পদস্খলন তাদের গোটা সভ্যতার উপর অভিশাপ হিসাবে ব্রিটিশদের ডেকে আনল। তারা শাসক হয়েই পূর্বের মুসলিম শাসিত অঞ্চলগুলোর মানুষের জীবনব্যবস্থাটা আমূল পাল্টে দিল। তারা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাবঞ্চিত করে, কর্মবঞ্চিত করে একেবারে গণ্ডমূর্খ বানিয়ে ফেলল, শাসকের জাতিকে দাসের জাতিতে রূপান্তরিত করল, কৃষিকাজ হয়ে গেল তাদের প্রধান পেশা। দুইশ বছর গোলামির পর এই জাতির মনে মগজে গোলামি বেশ শক্তপোক্তভাবে আসন গেড়ে বসেছে। এরই মধ্যে মুসলমানেরা ভুলেও গেছে যে ইসলাম কেবল নামাজ-রোজা না, ইসলাম দিয়ে বিশ্ব চালানো যায়। জীবনের সর্বাঙ্গনের পূর্ণ ব্যবস্থা ইসলামে আছে। এই কথাগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করল রাজনৈতিক ইসলামী দলগুলো। তারা শাসনব্যবস্থায় ইসলামকে নিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগল।
এখানে একটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, মুসলিম বিশ্বে শত শত বছর ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা রাজতন্ত্র চলেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে। প্রমাণের চেষ্টা চলেছে যে, রাজতন্ত্রের সাথে ইসলামের তেমন কোনো বিরোধ নেই। আবার যখন বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের জোয়ার বইছিল, তখন কোর’আন-হাদিস-ইতিহাস ঘেটে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সমাজতন্ত্রকে ‘ইসলামসম্মত’ প্রমাণ করা হলো। এর ভিত্তিতে দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক ইসলামি (Islamic socialism) দল গঠন করা হলো। তারা বলতে লাগল, খলিফা ওমর (রা.) হলেন আদর্শ সাম্যবাদী শাসকের উদাহরণ। পরে যখন সমাজতন্ত্রের বাস্তবরূপ মানবজাতি প্রত্যক্ষ করল, স্বপ্নবিলাস টুটে গেল। পতন হলো সমাজতন্ত্রের। আজ যখন বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের জোয়ার বইছে তখন রাজনৈতিক ইসলামের চিন্তানায়কগণ কমুনিজমকে কুফরি মতবাদ ফতোয়া দিয়ে গণতন্ত্রের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। তারা এবার গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। তারা কথিত বাতিলের বিরুদ্ধে জেহাদ করছেন, জাতিকে ইসলাম শিখাচ্ছেন, গবেষণামূলক ইসলামী বই লিখছেন- সেগুলোর নাম দিচ্ছেন ইসলামী সাহিত্য। আর তাতে মোটাদাগে যে কথাটি উল্লেখ থাকছে তাহলো- ইসলাম হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ধর্ম! খলিফা আবু বকর (রা.) গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং গণতন্ত্র মেনেই খেলাফত করে গেছেন। তিনি মজলিশে শুরা বানিয়েছিলেন যা হচ্ছে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, কোনোভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যদি হিটলার-মুসোলিনি বিজয়ী হতেন তাহলে রাজনৈতিক ইসলামীরা ফ্যাসিবাদি ইসলাম আবিষ্কার করে ফেলতেন এবং স্বয়ং রসুল ও তাঁর খলিফাদেরকে সর্বকালের সেরা একনায়ক বলে প্রমাণ করে দিতেন। গরু আর বাঘ উভয়ই পশু। তাদের একটি করে মাথা, নাক ও লেজ, দুটো করে চোখ-কান, চারটা করে পা, লোমে আবৃত শরীরসহ অজস্র মিল রয়েছে, তাই বলে কি গরু আর বাঘ এক হয়ে গেল? তাদের উভয়ের মধ্যে অমিলও রয়েছে অসংখ্য। গরু শিংযুক্ত খুরবিশিষ্ট তৃণভোজী, নিরীহ পোষা প্রাণী আর বাঘ ঠিক উল্টো, সে মাংসভোজী, হিংস্র, ভয়ঙ্কর, বন্য, ধারাল দাঁত ও নখরবিশিষ্ট, দ্রুতগামী। এভাবেই প্রতিটি জীবনব্যবস্থার মধ্যে খুঁজলে অসংখ্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে বহু মৌলিক বিষয়ে বৈপরীত্য রয়েছে। দীনের মূল বিষয়ই হচ্ছে সার্বভৌমত্ব কার। এটাই হচ্ছে দীনের ভিত্তি। গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির, সমাজতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব একটি বিশেষ শ্রেণির যাদের পলিট ব্যুরো বলা হয়। রাজতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব রাজার। আর ইসলামের সার্বভৌমত্ব হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর। যখন ভিত্তিই আলাদা তখন গৌণ বিষয়ের সাযুজ্য সন্ধান করে ইসলমকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির সাথে তুলনা করা হাস্যকর। ইসলাম ইসলামই। অন্যান্য তন্ত্র-মন্ত্রের মধ্যে যারা ইসলাম খুঁজে বেড়ান তাদের অভিজ্ঞতা অন্ধের হাতি দেখার চেয়ে খুব ভালো হবে না। তাদেরকে যারা অনুসরণ করবে তারাও সেভাবেই পুরো হাতিকে বুঝতে পারবে না, জানতে পারবে না, দেখতে পারবে না।  [লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ফেসবুক: riyad.hassan.ht]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ