দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

এমামুয্যামান মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর লেখা থেকে:
শেষ নবীর উপর আল্লাহ দায়িত্ব দিলেন মানবজীবনে হেদায়াহ ও সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার (সুরা আল ফাতাহ-২৮, সফ-৯, তওবা-৩৩)। এটা এই কারণে যে, আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন প্রতিষ্ঠা হলে পৃথিবী থেকে যাবতীয় অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ-রক্তপাত, হানাহানি, মারামারি এককথায় অশান্তি নির্মূল হয়ে যাবে; মানবজাতি শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল যে, সে মানবজাতিকে ফাসাদ (অন্যায়-অবিচার) ও সাফাকুদ্দিমাতে (রক্তপাত) পতিত করবে সে চ্যালেঞ্জে আল্লাহ জয়ী হবেন। তাই এই মহান কাজ করার জন্য রসুল তাঁর নিজ হাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে উম্মতে মোহাম্মদী নামক একটি জাতি গঠন করলেন। অতঃপর সে জাতির জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি শিক্ষা দিলেন। জানিয়ে দিলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে জাতির কাজ কী, কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এভাবেই উম্মতের প্রতি দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়ে তিনি তাঁর প্রভুর কাছে চলে গেলেন। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাস।
উম্মতে মোহাম্মদী ডানে-বাঁয়ে না চেয়ে (হানিফ) একাগ্র লক্ষ্যে তাদের কর্তব্য চালিয়ে গেল প্রায় ৬০/৭০ বছর। এবং এই অল্প সময়ের মধ্যে তদানীন্তন পৃথিবীর এক উল্লেখযোগ্য অংশে এই শেষ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করল। তারপর দুর্ভাগ্যক্রমে আরম্ভ হলো উদ্দেশ্যচ্যুতি, আকীদার বিচ্যুতি। যে কোন কিছুরই যখন উদ্দেশ্যচ্যুতি ঘটে তখন তার আর কোনো দাম থাকে না, হোক সেটা জাতি, দল, সমিতি, প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তি- যাই হোক। যে মুহূর্ত থেকে উদ্দেশ্য বিলুপ্ত হয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে যে কোনো জিনিস অর্থহীন হয়ে যায়।
মহানবীর (দ:) ৬০/৭০ বছর পর থেকে প্রধানতঃ কী কী বিকৃতি প্রবেশ করে এই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতিকে নিকৃষ্টতম জাতিতে পরিণত করল তা একটা একটা করে উপস্থিত করছি। কিন্তু সর্বক্ষণ মনে রাখতে হবে যে, সমস্ত বিকৃতির মূল হলো উদ্দেশ্যচ্যুতি, লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া, আকীদা বদলে যাওয়া। যতদিন এই উম্মাহর সামনের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ঠিক ছিল ততদিন তারা একাগ্র লক্ষ্যে (হানিফ) সামনে এগিয়ে গেছে। ছোটখাটো কোনো কিছুই তাদের দৃষ্টি ঘোরাতে পারে নি। কিন্তু যখন লক্ষ্য হারিয়ে গেল তখন চলাও থেমে গেল, চারদিকের নানা কিছু তখন চোখে পড়ল এবং তাই নিয়ে তারা মশগুল হয়ে গেলেন, মহাকর্তব্য ভুলে গেলেন এবং ফলে বিভিন্ন বিকৃতি ঢুকে তাদের ধ্বংস করে দিল।
প্রথম বিকৃতি হলো অতি বিশ্লেষণ, দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি। পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার পর তাদের জাতির যার যার দীনকে নিয়ে সেটার ব্যাখ্যা, অতি ব্যাখ্যা, আরও অতি ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে। যার ফলে ঐ বিভিন্ন ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মতামত গড়ে উঠেছে। দীনের আসল উদ্দেশ্য, তার মর্মবাণী ভুলে যেয়ে ছোটখাটো বিভিন্ন ব্যবস্থা, ফতওয়া নিয়ে মতান্তর শুরু হয়ে গেছে এবং ফলে বহুভাগে ভাগ হয়ে জাতিগুলির ঐক্য নষ্ট হয়ে জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর যেন পুনঃসংঘটন এই শেষ দীনেরও না হয় সেজন্য আল্লাহ সাবধান করে দিলেন এই বলে যে, দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না (কোর’আন-সুরা আন নিসা ১৭১, সুরা আল মায়েদা ৭৭)। দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করার এই নিষেধের অর্থ কী? এর মানে কি এই যে, খুব ধার্মিক হয়োনা বা দীনকে ভালোভাবে অনুসরণ কর না, বা বেশি ভালো মুসলিম হবার চেষ্টা কর না? অবশ্যই তা হতে পারে না। এই বাড়াবাড়ির অর্থ, ঐ অতি বিশ্লেষণ, জীবন-বিধানের আদেশ নিষেধগুলিকে নিয়ে সেগুলোর সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিশ্লেষণ। যদি জাতির সম্মুখ থেকে তাদের লক্ষ্যস্থল, গন্তব্যস্থল, উদ্দেশ্য- অদৃশ্য না হয়ে যেত তবে তারা আগের মতই এক দেহ এক প্রাণ হয়ে তাদের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য আপ্রাণ সংগ্রাম চালিয়ে যেতেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয় নি। লক্ষ্য তারা ভুলে গেলেন এবং লক্ষ্য ভুলে যাওয়ার ফলেই ঐ সংগ্রামের কর্মশক্তি মোড় ঘুরে অন্য কাজে ব্যাপৃত হয়ে পড়ল। যে জীবন-বিধানকে সমস্ত পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ তাঁর শেষ নবীকে (দ:) পাঠিয়েছিলেন এবং যে দায়িত্ব তিনি তাঁর উম্মাহর উপর অর্পণ করে চলে গিয়েছিলেন, উম্মাহও তা উপলব্ধি করে সমস্ত কিছুর মায়া ত্যাগ করে আটলান্টিকের তীর থেকে ৬০/৭০ বছরের মধ্যে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, পরবর্তীতে সেই সত্য, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছেড়ে দিয়ে ঐ জাতি ঐ বিধানগুলির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আরম্ভ করে দিল।
আদম (আ:) থেকে শুরু করে শেষনবী (দ:) পর্যন্ত আল্লাহ যে দীন মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন, স্থান, কাল ভেদে সেগুলোর নিয়ম-কানুনের মধ্যে প্রভেদ থাকলেও সর্বক্ষণ ভিত্তি থেকেছে একটি মাত্র। সেটা হচ্ছে একেশ্বরবাদ (Monothism), তওহীদ, একমাত্র প্রভু, একমাত্র বিধাতা (বিধানদাতা) আল্লাহ। যার আদেশ নির্দেশ, আইন-কানুন ছাড়া অন্য কারো আদেশ, নির্দেশ, আইন-কানুন কিছুই না মানা। একেই আল্লাহ কোর’আনে বলছেন দীনুল কাইয়্যেমা। আল্লাহ মানুষের কাছে এইটুকুই মাত্র চান। কারণ তিনি জানেন যে, মানুষ যদি সমষ্টিগতভাবে তিনি ছাড়া অন্য কারো তৈরি বিধান না মানে, শুধু তারই বিধান মানে তবে শয়তান তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে দিয়ে অশান্তি, অন্যায় আর রক্তপাত অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং মানুষ সুবিচারে, শান্তিতে (ইসলামে) পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবে- অর্থাৎ আল্লাহ যা চান। কত সহজ! কাইয়্যেমা শব্দটা এসেছে কায়েম থেকে যার অর্থ চিরন্তন, শাশ্বত, সনাতন। আল্লাহ এই দীনুল কাইয়্যেমার কথা বলে বলছেন- এর বেশি তো আমি আদেশ করিনি (কোর’আন- সুরা আল-বাইয়েনাহ্ ৫)। ‘এর বেশি তো আমি আদেশ করিনি’ তিনি বলছেন এই জন্য যে, তিনি জানেন যে, ঐটুকু করলেই অর্থাৎ তাঁর বিধান ছাড়া অন্য কোনো বিধান মানুষ না মানলেই মানবজাতির মধ্যে পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সামান্য দাবিটুকুই তিনি মানুষের কাছে আদম থেকে আজ পর্যন্ত করে আসছেন। পূর্ববর্তী বিকৃত জীবন-ব্যবস্থাগুলিতেও আল্লাহর দাবি ছিল ঐ সহজ সরল দাবি- দীনুল কাইয়্যেমা, তওহীদ।
আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ:) যে জাতি সৃষ্টি করলেন তার ভিত্তি করলেন অতি সহজ ও সরল-তওহীদ, একমাত্র প্রভু হিসাবে তাকেই স্বীকার করে নেওয়া। এর নাম দিলেন দীনুল কাইয়্যেমা ও সেরাতুল মোস্তাকীম, চিরন্তন, সহজ-সরল পথ। এটাই যে সব কিছু তা বোঝাবার জন্য অবশ্য কর্তব্য (ফরজ) করে দিলেন প্রতি রাকাতে ঐ সেরাতুল মুস্তাকীমে চালাবার প্রার্থণা করা, যাতে প্রতিটি মুসলিমের সর্বক্ষণ এ সহজ-সরল পথের কথা মনে থাকে এবং ঐ সহজ সরলতার ভিত্তি ছেড়ে জটিলতার দিকে সরে না যায়। এবং জাতির লক্ষ্যও স্থির করে দিলেন অতি সহজ ও সরল-ঐ দীনুল কাইয়্যেমাকে, সেরাতুল মোস্তাকীমকে সংগ্রামের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীতে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করা। দুটোই বুঝতে সহজ। সহজ বলেই বিশ্বনবীর (দ:) সৃষ্ট অত্যন্ত অশিক্ষিত জাতিটি, যার মধ্যে লেখাপড়া জানা লোকের সংখ্যা হাতে গোনা যেত- তারাও ভিত্তি ও লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা থেকে চ্যুত হন নি এবং তারা সফলভাবে আল্লাহ রসুলের (দ:) উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে বহু দূর অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু অতি বিশ্লেষণের বিষময় ফলে ঐ দীনুল কাইয়্যেমা, সেরাতুল মোস্তাকীম হয়ে গেল অত্যন্ত জটিল, দুর্বোধ্য এক জীবন-বিধান, যেটা সম্পূর্ণ শিক্ষা করাই মানুষের এক জীবনের মধ্যে সম্ভব নয়- সেটাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তো বহু দূরের কথা। জাতি লক্ষ্যচ্যুত তো আগেই হয়ে গিয়েছিল, তারপর ফকিহ ও মুফাস্সিরদের সূক্ষ্মাতিষূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ফলে জাতির মধ্যে ভয়াবহ বিভেদ সৃষ্টি হয়ে, বিভিন্ন মাযহাব ও ফেরকা সৃষ্টি হয়ে যে অনৈক্য সৃষ্টি হলো তার ফলে পুনরায় একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেল।
অতি বিশ্লেষণ করে দীনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট করে দেওয়ার কাজটা আজকের নতুন নয়, শুধু আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিত আলেম-মাওলানারাই যে এই কাজ করেছেন তাই নয়। পূর্ববর্তী দীনগুলোতেও অতি-ধার্মিকরা গজিয়েছেন ও পাণ্ডিত্য জাহির করে তাদের দীনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে একটি উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁর নবী মুসার (আ:) জীবনী থেকে যেখানে আল্লাহ বনী ইসরাইলদের একটি গরু কোর’বানি করতে আদেশ দিলেন। মুসা (আ:) যখন এই কোরবানির আদেশ বনী ইসরাইলদের জানিয়ে দিলেন তখন যদি তারা মোটামুটি ভালো একটি গরু এনে কোরবানি করে দিত তাহলে তাতেই কাজ হয়ে যেত। কারণ কোরবানির গরুটা কেমন হবে সে সম্বন্ধে আল্লাহ কোনো শর্ত দেন নি। কিন্তু আল্লাহ কোর’আনে বলছেন- বনী ইসরাইল তা করে নি। তারা মুসার (আ:) মাধ্যমে আল্লাহকে প্রশ্ন করতে লাগল- গরুটার বয়স কত হবে, গায়ের রং কী হবে, সেটা জমি চাষের জন্য শিক্ষিত কিনা, জমিতে পানি দেয়ার জন্য শিক্ষিত কিনা, ওটার গায়ে কোন খুঁত থাকতে পারবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি (কোর’আন- সুরা আল-বাকারা ৬৭-৭১)। তারা প্রশ্ন করে যেতে লাগল আর আল্লাহ তাদের প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। তারপর যখন প্রশ্ন করার মতো আর কিছুই রইল না তখন স্বভাবতঃই ঠিক অমন একটি গরু পাওয়া দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। একটা সহজ সরল আদেশ- “একটা গরু কোরবানি কর” এটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এমন কঠিন করে ফেলা হলো যে, অমন গরু আর পাওয়া যায় না। এই জাতির মহা পণ্ডিতরাও বিশ্বনবীর (দ:) ওফাতের ৬০/৭০ বছর পর ঠিক ঐ কাজটিই মহা ধুমধামের সাথে আরম্ভ করলেন। দু’টি মাত্র আদেশ- আমাকে ছাড়া কাউকে মানবে না, আমার দেয়া জীবন-বিধান ছাড়া আর কোনো বিধান মানবে না, আর এই জীবন-বিধানকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করবে। সহজ, সরল দু’টি আদেশ। বিশ্বনবীর (দ:) উম্মাহ ইস্পাতের মতো কঠিন ঐক্য নিয়ে ঐ কাজ করতে আরব থেকে বের হয়ে অবিশ্বাস্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। পূর্ববর্তী দীনের পণ্ডিতদের মতো এ উম্মাহর পণ্ডিতরাও একে ধ্বংস করে দিলেন।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমি ফিকাহ বা ফকিহদের বিরুদ্ধে বলছি না। কারণ কোর’আন ও হাদিস থেকে জীবন বিধানের নির্দেশগুলি একত্র ও বিন্যাস করলে যা দাঁড়ায় তাই ফিকাহ- অর্থাৎ ফিকাহ ছাড়া কোনো মুসলিমের জীবনব্যবস্থা অনুসরণ অসম্ভব। আমার বক্তব্য ঐ ফিকাহর অতি বিশ্লেষণ, সূ²াতিসূ² বিশ্লেষণ যা আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ:) কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আমাদের ফকিহরা যদি কোর’আন-হাদিসের মৌলিক আদেশ নিষেধগুলিকে সুন্দরভাবে শ্রেণি বিন্যাস করেই ক্ষান্ত হতেন এবং লিখতেন যে এই-ই যথেষ্ট- এরপর আর অতিরিক্ত বিশ্লেষণে যেও না, কারণ আল্লাহ বলেছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না এবং রসুলাল্লাহও (দ:) নিষেধ করেছেন, তাহলে তাদের কাজ হতো অতি সুন্দর। ইসলামকে প্রকৃতভাবে সেবা করা হতো এবং আল্লাহর কাছ থেকে তারা পেতেন প্রচুর পুরস্কার। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে তারা তা করেন নি। তারা আজীবন কঠিন পরিশ্রম করে আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলি ও বিশ্বনবীর (দ:) কাজ ও কথাগুলিকে সূ² থেকে সূ²তম বিশ্লেষণ করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পূর্ণভাবে পালন করা প্রায় অসম্ভব এবং কেউ চেষ্টা করলে তার জীবনে অন্য আর কোনো কাজ করা সম্ভব হবে না, এ দীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ফকিহরা তাদের ক্ষুরধার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকে হাজার হাজার মাসলা-মাসায়েল সৃষ্টি করেছেন। প্রধান প্রধান গণের এক এক জনের সিদ্ধান্তের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। জাতি ঐ মাসলা-মাসায়েলের মাকড়সার জালে জড়িয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে গেছে, স্থবির হয়ে গেছে।
সেরাতুল মোস্তাকীমের সহজতার, সরলতার মহাগুরুত্ব উপলব্ধি করে রসুলাল্লাহ (দ:) এক হাদিসে বললেন- দীন সহজ, সরল (সেরাতুল মোস্তাকীম), একে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করবে তারা পরাজিত হবে। অন্য হাদিসে বললেন, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে (হাদিস- আবু হোরায়রা (রা:) থেকে মুসলিম)। এই সাবধানবাণীতেও আশ্বস্থ না হতে পেরে বিশ্বনবী (দ:) আরও ভয়ংকর শাস্তির কথা শোনালেন। বললেন- কোর’আনের কোনো আয়াতের অর্থ নিয়ে বিতর্ক কুফর। এবং কোনো অর্থ নিয়ে মতান্তর উপস্থিত হলে আমাদেরকে কী করতে হবে তারও নির্দেশ তিনি আমাদের দিচ্ছেন। বলছেন, কোনো মতান্তর উপস্থিত হলে তা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও (হাদিস- মুসলিম, মেশকাত)। অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে যখনই মতান্তর উদ্ভব হবে তখনই চুপ হয়ে যাবে, কোনো তর্ক-বিতর্ক করবে না। অর্থাৎ বিতর্কে যেয়ে কুফরি করবে না, এবং যে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই সেই সেরাতুল মোস্তাকীম, দীনুল কাইয়্যেমাকে আঁকড়ে ধরে থাক, এখানে লক্ষ্য করার একটা বিষয় আছে, দীনের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ককে আল্লাহর রসুল (দ:) কোন পর্যায়ের গুনাহ, পাপ বলে আখ্যায়িত করছেন। চুরি নয়, হত্যা নয়, ব্যভিচার নয়, বলছেন- কুফর। যার চেয়ে বড় আর গোনাহ নেই, শুধু তাই নয় যা একজনকে এই দীন থেকেই বহিষ্কৃত করে দেয়। এতবড় শাস্তি কেন? শেষ নবীর (দ:) হাদিস থেকেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। তিনি বলছেন- তোমরা কি জান, ইসলামকে কিসে ধ্বংস করবে? এই প্রশ্ন করে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছেন- শিক্ষিতদের ভুল, মোনাফেকদের বিতর্ক এবং নেতাদের ভুল ফতোয়া। যে কাজ ইসলামকেই ধ্বংস করে দেয় সে কাজের চেয়ে বড় গোনাহ আর কী হতে পারে! তাই বিশ্বনবী (দ:) এই কাজকে কুফ্রি বলেছেন।
এই জাতির মহা দুর্ভাগ্য। আল্লাহর ও তাঁর রসুলের (দ:) এতসব কঠোর সতর্কবাণী এই উম্মাহর পণ্ডিতদের কিছুই মনে রইল না। তারা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন-হাদীসের সূক্ষ্মাতিষূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে এক বিরাট ফিকাহ শাস্ত্র গড়ে তুললেন। এদের মণীষার, প্রতিভার, অধ্যবসায়ের কথা চিন্তা করলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, কিন্তু তাদের ঐ কাজের ফলে এই উম্মাহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেল। শত্রুর কাছে পরাজিত হয়ে গেল।
ফিকাহর যে অতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার পক্ষে একটি যুক্তি আছে এবং সে যুক্তি আমি সম্পূর্ণ স্বীকার করি। সেটা হচ্ছে ইসলামের আইন-কানুনের বিচারালয়ে ব্যবহার। অর্থাৎ বিচারালয়ে এই আইনের সূক্ষ্ম প্রয়োগ যাতে কোনো নিরাপরাধ শাস্তি না পায়। অনৈসলামিক যেসব আইন বর্তমানে পৃথিবীতে চালু আছে, অর্থাৎ মানুষ-রচিত আইনগুলি, এগুলিও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেই বিচরালয়গুলিতে বিচার করা হয়- উদ্দেশ্য সেই একই- সুবিচার। কিন্তু সে জন্য কোনো দেশেই জ্ঞানের অন্যান্য সমস্ত শাখাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করে সেই দেশের সংবিধানের এবং আইনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়নি। শুধু যারা আইনজ্ঞ হতে চান, আইনজীবী হতে চান তারা স্ব-ইচ্ছায় ঐ বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করেন, ডিগ্রী নেন এবং তারপর আদালতে যোগ দেন। অর্থাৎ চিকিৎসা, প্রকৌশল, স্থাপত্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা ইত্যাদির মতো আইনকেও একটি বিশেষ (Specialised) জ্ঞান হিসাবে শিক্ষা করেন। কিন্তু আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিতরা তা না করে জাতির মধ্যে এমন একটা ধারণা সৃষ্টি করে দিলেন যে আইনজ্ঞ হওয়াই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত, জ্ঞানের অন্যান্য শাখা শিক্ষা করার কোনো প্রয়োজন এ জাতির নেই। এই কাজের আবশ্যম্ভাবী পরিণতি যা হবার তাই হলো, জাতি জ্ঞানের অন্যান্য শাখাসমূহে যে বিস্ময়কর জ্ঞানচর্চা করে পৃথিবীর শিক্ষকের আসন লাভ করেছিল তা ছেড়ে দিয়ে একটি মূর্খ, অশিক্ষিত জাতিতে পরিণত হলো। উদাহরণরূপে বলা যায় যে, আজকের কোনো রাষ্ট্রে যদি শিক্ষানীতি এই করা হয় যে, সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও ঐ সংবিধান নিসৃতঃ আইন-কানুন ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই একমাত্র শিক্ষার বিষয়বস্তু হবে, বর্তমানের মাদ্রাসা শিক্ষার মতো, তবে কী হবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তাহলে বিদ্যালয়গুলিতে নিচু ও প্রাথমিক শ্রেণি থেকেই ঐ বিষয় একমাত্র পাঠ্যবিষয় করা হবে। দু’এক প্রজন্মের মধ্যেই ঐ রাষ্ট্রের লোকজন শুধু তাদের দেশের সংবিধান ও আইন-কানুনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া আর কিছুই জানবে না, অন্যান্য সব বিষয়ে অজ্ঞ হয়ে যাবে। জাতির যা ভাগ্য হওয়া উচিত তাই হলো- অন্য জাতির কাছে পরাজিত হয়ে যে সংবিধান ও আইন-কানুন নিয়ে এত বিশ্লেষণ করা, সেই আইন-কানুন বাদ দিয়ে বিজয়ী জাতির আইন-কানুন গ্রহণ করা হলো। নিজেদের আইন-কানুন সংবিধান শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো রকমে টিকে রইল। যে বিচারক (কাজী) পাঁচশত বছর আগে আদালতে রায় (ফতোয়া) দিতেন, তখন তারা শাসক ছিলেন আর আজ সেই রায়ের বই (ফতোয়ার কেতাব) পড়ে পড়ে মুফতি হওয়ার মধ্যে কী তাৎপর্য রয়েছে তা বুঝে আসে না। তিনশত বছর আগে থেকেই তো এরা অন্য জাতির গোলাম। ব্রিটিশের আইন মোতাবেক রায় (ফতোয়া) দেওয়া হচ্ছে, এখানে এদের ফতোয়ার কী মূল্য? যে আইন শিক্ষাকেই একমাত্র শিক্ষণীয় বলে ঘোষণা করা হলো, মুসলিম দুনিয়াতে আজ সেই আইনে বিচার হয় না, বিচার হয় পাশ্চাত্যের মানুষের তৈরি, গায়রুল্লাহর আইনে, দণ্ড হয় পাশ্চাত্যের দণ্ডবিধি মোতাবেক অর্থনীতি পরিচালিত হয় পাশ্চাত্যের সুদভিত্তিক অর্থনীতি মোতাবেক। অথচ এ সবই ফিকাহ শাস্ত্রের আওতাধীন। তবুও এদের মাদ্রাসগুলিতে অন্ধের মতো এগুলো পড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে, শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। যে আইনের প্রয়োগই নেই সেই আইনই শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কী নিষ্ঠুর পরিহাস! অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর। তাই আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ:) বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। কাউকে বাড়াবাড়ি করতে দেখলেই রাগে বিশ্বনবীর (দ:) পবিত্র মুখ লাল হয়ে যেত। কারণ তিনি জানতেন যে, অতি বড় সুন্দরী ও অতি বড় ঘরনীর মতো অতি বড় মুসলিম না পায় দুনিয়া না পায় জান্নাত।
খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ফলে মাসলা-মাসায়েলের জটিল জালে আটকা পড়ে সমস্ত জাতিটাই মাকড়সার জালে আটকা পড়া মাছির মতো অসহায়, স্থবির হয়ে গেল। ঐ স্থবিরতার অবশ্যম্ভাবী ফল হয়েছে শত্রুর ঘৃণিত গোলামি ও বর্তমান অবস্থা; যেখানে অজ্ঞানতায়, অশিক্ষায়, কুশিক্ষায় ইসলামের আগের জাহেলিয়াতের অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই জাতির অধিকাংশ আলেম সাহেব আজ কুয়োর ব্যাঙ। দুনিয়ার খবর যারা রাখেন তাদের চোখে এরা অবজ্ঞার পাত্র, হাসির খোরাক। আসমানের মতো বিরাট উদাত্ত দীনকে এরা তাদের লম্বা কোর্তার পকেটে পুরে মিলাদ পড়ে, বাড়ী বাড়ী দাওয়াত খেয়ে আর সুর করে ওয়াজ করে বেড়ান। তবু যদি তাদের ওয়াজের মধ্যে অন্তত কিছু সার কথা থাকত! তাও নেই, কারণ দীনের মর্মকথা, এর উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া এ সবের কিছুই তাদের জানা নেই। আসল দিক অর্থাৎ জাতীয় জীবনের দিকটাকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তি দিকটার সামান্য যে বাহ্যিক অংশকে এরা আঁকড়ে ধরে আছেন তা পর্যন্ত ভুল। তুচ্ছ মসলা-মাসায়েল নিয়ে সীমাহীন তর্কাতর্কি বাদানুবাদ করে করে এরা এই জাতির ঐক্য নষ্ট করে দিয়েছেন, যে ঐক্য ছাড়া একটা জাতি ধ্বংস হয়ে যায়, এমন কি দুর্বল শত্রুর হাতেও পরাজিত হয়ে যায়। আর তাই গিয়েছিলও। কিন্তু তাতেও বোধোদয় হয় নি, অসীম অজ্ঞতায় তারা আজও ঐ খুঁটিনাটি মসলা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে ব্যস্ত। এই ঘৃণিত কাজে এমন পর্যায়ে গেছেন যে, সুরা ফাতেহার শেষ শব্দটির উচ্চারণ দোয়াল্লীন হবে, না যোয়াল্লীন হবে এই নিয়ে এরা বহু বছর ধরে তর্ক-বিতর্ক করে আসছেন, বছরের পর বছর বাহাস করছেন, বই লিখেছেন, এমন কি মারামারি করে প্রাণে মারা গেছেন। অথচ এটা একটা বিতর্কের বিষয়ই নয়। পৃথিবীর সব জায়গার লোক সব অক্ষর উচ্চারণ করতে পারে না, কিন্তু কোর’আন সবাইকে পড়তে হয়।
মাসলা-মাসায়েলের চুলচেরা বিশ্লেষণ দীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে জাতিকে কতখানি বঞ্চিত করছে তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। লখনু থেকে উর্দু ভাষায় একটি ‘ধর্মীয়’ মাসিক পত্রিকা বের হতো। তাতে যথারীতি মাসলা-মাসায়েলের কুট-তর্কাতর্কি তো থাকতই আর থাকত পাঠকদের প্রশ্নোত্তর। একটা প্রশ্নের উদ্ধৃতি দিচ্ছি:- “একটা তাবুর ভেতরে একদল লোক জামাতে নামাজ পড়ছে। ইমাম পাক-সাফ আছেন, কিন্তু তাবুটার এক কোণে নাজাসাত অর্থাৎ অপবিত্র কিছু লেগে আছে। ইমাম সাহেব যখন দাঁড়ান তখন তার মাথার টুপিটা তাবুর কাপড় স্পর্শ করে। এ অবস্থায় পেছনের সকলের নামাজ যায়েজ হবে কি হবে না?”
অর্থাৎ ইমাম সাহেবের টুপি তাবু স্পর্শ করলে, তাবুর কোণে লেগে থাকা অপবিত্রতাটা ইলেকট্রিকের মতো তাবুর কাপড় বেয়ে ইমাম সাহেবের টুপি হয়ে তাকে অপবিত্র করে দেয় কিনা? একবার চিন্তা করে দেখুন, বুদ্ধি-মস্তিষ্কের কী হাস্যকর অপব্যবহার! আরও করুণ কথা হলো, যে সময়ের কথা বলছি, তখন সমস্ত দেশটি একটি পাশ্চাত্য খ্রিস্টান শক্তির পদানত, যারা এ দীনের জাতীয় শরিয়াহ অর্থাৎ এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, দণ্ডবিধি ইত্যাদি সমস্ত ব্যবস্থা অবৈধ করে দিয়ে তাদের নিজেদের তৈরি ব্যবস্থা এ জাতির উপর চাপিয়ে রেখেছে। কোথায় তারা ব্রিটিশদের আইন ও শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, আবার মুসলিম হবার চেষ্টা করবে, তা না, তারা তাবুতে টুপি লাগছে বলে নামাজ যায়েজ হচ্ছে কি হচ্ছে না তাই নিয়ে গবেষণা করছে। এদিকে আল্লাহর চোখে তারা যে মুসলিম নয়, মো’মেনই নয়, তাবুতে নাপাকী থাক না থাক, তাদের নামাজ যে নামাজই নয়- সে জ্ঞানও তাদের নাই।
আল্লাহর রসুল (দ:) বারবার নিষেধ করে গেছেন দীনের অতি বিশ্লেষণ করতে। বহু হাদিসে এর উল্লেখ আছে। কিন্তু আমাদের ওলামা, মাশায়েখ, ওয়ায়েজরা তাদের ওয়াজে, উপদেশে ওগুলো উল্লেখ করেন না, কারণ ওগুলো তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। মতভেদের সর্বপ্রধান উৎস স্বভাবতই কোর’আনের আয়াতসমূহ অর্থাৎ আয়াতের অর্থ। হাদিসে উল্লেখ আছে- একদিন বিশ্বনবী (দ:) দুইজন সাহাবাকে কোর’আনের একটি আয়াতের অর্থ নিয়ে তর্ক করতে দেখে রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিলেন। রিপু জয়ী, নফস বিজয়ী সেই সিদ্ধ পুরুষ, মহাবিপদে যিনি নির্ভয়, প্রশান্ত, মাথায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়লেও যিনি অটল, অসহনীয় অত্যাচারে যিনি নিষ্কম্প, চরম শত্রুকে যিনি পরম স্নেহে ক্ষমা করেন তিনি যখন রেগে লাল হন তখন অবশ্যই বুঝতে হবে ব্যাপার সাধারণ নয়। আমরা পাই- সেই ইনসানে কামেল আয়াতের অর্থ নিয়ে তর্ক শুনে রেগে শুধু লাল-ই হননি, বলেছিলেন কোর’আনের আয়াতের অর্থ নিয়ে বাদানুবাদ কুফর। কী সাংঘাতিক কথা! কুফর, একেবারে ইসলাম থেকে বহিষ্কার, যার মাফ নেই। আর একবার পাই তাকে রাগে লাল অবস্থায় যখন একজন সাহাবা তাঁকে (দ:) একটু খুঁটিয়ে মাসলা-মাসায়েল জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমাদের একথা নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে যে, মহানবী (দ:) সাধারণ ব্যাপারে অত রাগেননি। যে ব্যাপারে তিনি দেখতে পেয়েছেন যে, এটা একেবারে উম্মাহর জীবন-মরণের প্রশ্ন, তাঁর সারা জীবনের সাধনার সাফল্য ব্যর্থতার প্রশ্ন, ভবিষ্যতে তাঁর সৃষ্ট জাতির ভাগ্যের প্রশ্ন, শুধু তখনই অত রাগান্বিত হয়েছেন।
একটা বিরাট বাড়িকে যদি বিবর্ধক কাঁচ দিয়ে দেখেন তবে দেয়ালকে বিরাট পাহাড়ের মতো দেখবেন, দেয়ালের অতি ছোট্ট ফাটলকে অনেক বড় আকারে দেখবেন, বালিকণাগুলোকেও দেখবেন অনেক বড়, ফলে ঘরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বুঝতে পারবেন না। বাড়িটা সম্পর্কে আপনি আসলে অজ্ঞই থেকে যাবেন। আজ দীনকে, জীবন-ব্যবস্থাকে বিবর্ধক কাঁচ দিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁটিয়ে দেখতে যেয়ে সমগ্র দীন সম্বন্ধে এই যে অবিশ্বাস্য অন্ধত্ব, এই অন্ধত্বের জন্যই এই কথিত আলেম শ্রেণিটি জাতীয় জীবনে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেন না। পাশ্চাত্যদের চাপিয়ে দেওয়া সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি মেনে নিয়ে খুঁটিনাটি মাসলামাসায়েল নিয়েই ব্যস্ত।
আজ এই জাতি যেটা নিজেকে উম্মতে মোহাম্মদী বলে মনে করে, তার দুই প্রভু, দুই বিধাতা, দুই ইলাহ। এরা এক বিধাতার, ইলাহের এবাদাত করে প্রচুর নামাজ, রোযা, হজ্ব, যাকাত, দাড়ি-টুপি, কুলুখ, দোয়া-দরুদ, তাহাজ্জুদ, লম্বা কোর্তা, অপ্রয়োজনীয় ওয়াজ-চিৎকার করে যিকর করে, মেয়েদের বাক্সে ভরে, আর অন্য ইলাহের এবাদত করে তাদের তৈরি বিচার-ব্যবস্থায় বিচার করে, তাদের তৈরি দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি ও পুরস্কার দিয়ে, তাদের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্র অনুযায়ী রাজনৈতিক ও সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করে। এর চেয়ে বড় শেরক সম্ভব নয়, এর চেয়ে বড় বেদা’আতও সম্ভব নয়।
আল্লাহর প্রভুত্ব, সার্বভৌমত্বের প্রকৃত দরকার জাতীয় জীবনে, ব্যক্তিগত জীবনে নয়। ব্যভিচার ও চুরি ব্যক্তিগত জীবনের অপরাধ-গোনাহ; শয়তানের প্ররোচনার কাছে হেরে যেয়েই মানুষ ঐ অপরাধ করে। কিন্তু জাতীয় জীবনে আল্লাহকে বা তাঁর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা রিপুর কাছে পরাজয় নয়, চিন্তা ভাবনা করেই তা করা হয়। আল্লাহ অসীম ক্ষমাশীল, অসীম তাঁর অনুকম্পা তাই রিপুর কাছে পরাস্ত হয়ে অন্যায়, গোনাহ করে ফেলে তারপর অকপটে মাফ চাইলে তিনি মাফ করবেন (কোর’আন আন-নিসা ৪৮)। কিন্তু তাঁর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে তাঁর দেয়া জাতীয় জীবনব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে অন্যের তৈরি, গায়রুলাহর তৈরি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তিনি মাফ করবেন না, এটা তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন। কারণ এটা রিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পরাস্ত হয়ে করা হয় নি, অন্যের প্রভাবে অন্যের শিক্ষায় ভেবেচিন্তে করা হয়েছে- প্রকৃত শেরক, প্রকৃত কুফর। বর্তমানের এই দীনের ধারক বাহকদের ধর্মকর্ম দেখলে আমার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। এক ইরাকী হজ্বে আসবার আগে খলিফা ওমরের (রা:) ছেলে আবদাল্লাহর (রা:) সঙ্গে দেখা করে হজ্বে¡র সময় মাছি মারলে কী করতে হবে সে সম্বন্ধে ফতোয়া চাইলেন। আব্দাল্লাহ এবনে ওমর (রা:) বললেন, কী আশ্চর্য! যে ইরাকিরা আল্লাহর রসুলের (দ:) নয়নের মনি হুসাইনকে (রা:) হত্যা করেছে তারা মাছি মারার কাফফারার ফতোয়া জিজ্ঞাসা করছে। বিকৃত আকিদার ফলে আজ মুসলিম জগতের অবস্থা ঐ ইরাকির মতই।
[সম্পাদনায়: রাকীব আল হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ফেসবুক: rblee77, মতামতের জন্য যোগাযোগ: ০১৬৭০-১৭৪৬৪৩, ০১৬৭০-১৭৪৬৫১]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ