ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর যারা

মুস্তাফিজ শিহাব

যুগে যুগে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারাই নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছেন তাদের সকলকেই বেছে নিতে হয়েছে কণ্টকময় ত্যাগের রাস্তা। তারা নিজেদের ত্যাগের বিনিময় সত্য, ন্যায় ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং এর মাধ্যমে তাদের জীবনকে করেছেন সার্থক। আমাদের হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সদস্যগণও এই তালিকার বাইরে নয়। তারা যে মহাসত্য নিয়ে মানবজাতির সামনে দাঁড়িয়েছেন, যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তার জন্য তাদেরকেও অনেক বড় বড় ত্যাগ করতে হয়েছে যা বর্তমানের স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক দুনিয়ায় কল্পনাও করা যায় না। আমরা তাদের সে সকল ত্যাগের ঘটনাসমূহ বজ্রশক্তিদের পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি।

জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার চাঁপাগাছি হরিসপুর গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান জনাব মো. মাহদী হাসান সাগর। তিনি ১৯৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত মো. নুরুল ইসলাম। তিনি তার উপজেলার এফ ইউ পাইলট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম হাটহাজারী মেখল কওমী মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা শেষ করেন। আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে ধর্মব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। তিনিও প্রথামাফিক মসজিদের ইমামতি ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।

এরই মধ্যে আল্লাহ তার উপর বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দিলেন এবং তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করলেন। তার এক দুলাভাই (চাচাতো বোনের স্বামী) ছিলেন হেযবুত তওহীদের সদস্য। তিনি বগুড়ায় থাকতেন এবং বগুড়া থেকে প্রায়ই শশুর বাড়ি গেলে শ্যালক সাগরের সঙ্গে সময় কাটাতেন। তিনি প্রায়ই সাগরকে বলতেন যে ‘ভালো হয়ে যা’। সাগর দুলাভাইয়ের কাছ থেকে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য শুনতেন, কিন্তু তার দুলাভাই তখনও হেযবুত তওহীদের নাম তার কাছে প্রকাশ করেন নি। সাগর অবাক হয়ে আমাদের দেশের আর সব ইসলামিক দলগুলোর সাথে এই বক্তবকে মিলানোর চেষ্টা করতেন কিন্তু মিলাতে পারতেন না। একদিন ঐ দুলাভাই শশুর বাড়ি থেকে বিদায় নেবার সময় সাগরকে বললেন যে তিনি সত্য পেয়েছেন। এই কথা সাগরের মনে নাড়া দিল, কথাটি তিনি ভুলতে পারলেন না। “সত্য!” এ কথার পর তিনি ছুটলেন দুলাভাইকে ধরার জন্য যাতে এই কথার অর্থ বুঝতে পারেন। কিন্তু ততক্ষণে তার দুলাভাই বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গিয়েছেন। দীর্ঘ এক মাইল পথ ছুটে গিয়েও তিনি তার দেখা পেলেন না।
তারপর যেদিন তার দুলাভাই আবার আসেন তখন সাথে একটি পোর্টেবল ডিভিডি প্লেয়ার নিয়ে আসেন ও সর্বপ্রথম তাকে ‘ধর্মব্যবসা’ শিরোনামের প্রামাণ্য চিত্রটি দেখান। এরপর তার মনে আরো প্রশ্ন জাগে এবং তিনি স্থানীয় গোপিনাথপুর বাজার থেকে দৈনিক বজ্রশক্তি পত্রিকা সংগ্রহ করে পড়তে থাকেন। পত্রিকার নিবন্ধগুলো তাকে প্রচ-ভাবে নাড়া দেয় এবং তিনি ধীরে ধীরে সত্যকে উপলব্ধি করতে শুরু করেন। কিন্তু তার মনে একটি প্রশ্ন বরাবরই আসতো। তাহলে আমাদের ওস্তাদরা সবাই ভুল? আমরা সবাই ভুল? এতদিন তাহলে কী করলাম! দৈনিক বজ্রশক্তির আর্টিক্যালগুলো পড়ে যুক্তি খাতিরে তিনি প্রতিটি বিষয় মেনে নিলেও মন তখনও এই একটি প্রশ্নের জন্য আনচান করতো। এরপর তিনি কোর’আন ও হাদিসের চর্চা পুনরায় শুরু করলেন এবং তার সাথে হেযবুত তওহীদের বক্তব্যগুলোকে পুনরায় মিলাতে লাগলেন। এরফলে তার মনে সাহস বৃদ্ধি পেল এবং এরপর তিনি হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের জনসভার ভাষণগুলো শুনলেন।

এতকিছুর পর তার মনে একটিই আকাঙ্খা তৈরি হলো, হেযবুত তওহীদ সত্য, হেযবুত তওহীদে যোগ দিতে হবে! কিন্তু তিনি জানতেন যে ধর্মব্যবসা করলে হেযবুত তওহীদ করা যায় না, হেযবুত তওহীদের নীতিগুলোর একটি হচ্ছে ধর্মের কাজ করে কোন বিনিময় নেয়া যাবে না। তিনি তার দুলাভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে ধর্মব্যবসা ত্যাগ করলেন এবং গত ২৩ জুলাই ২০১৭ সাথে হেযবুত তওহীদে যোগদান করেন।

হেযবুত তওহীদে যোগদানের সাথে সাথে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়। প্রথমে তিনি ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম। তার প্রতি সবার শ্রদ্ধার দৃষ্টি ছিল। কিন্তু হেযবুত তওহীদের সদস্য হওয়ার সাথে সাথে সকলের তাকানোর ভাবভঙ্গি পাল্টে গেল। তাদের থানার ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের সাথে পাশের থানার ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলের মতো। কিন্তু সাগরের বিরুদ্ধে তারা একতাবদ্ধ হয়ে তাকে নানা রকম হুমকি দিতে লাগলো। তারা তাকে বুঝাতে লাগলো যে হেযবুত তওহীদ করলে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, হেযবুত তওহীদ বাতিল দল, হেযবুত তওহীদের এমাম মিথ্যা, হেযবুত তওহীদ মিথ্যা। তিনি তাদেরকে পবিত্র কোর’আনের কয়েকটি আয়াত খুলে দেখানে এবং স্পষ্ট করে নিজের মতামত জানিয়ে দিলেন। এরপর ধর্মজীবীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলো এবং তার অভিভাবকদেরকে তার বিরুদ্ধে উসকে দিতে লাগলো। বিশেষ করে তার নানাকে তার বিরুদ্ধে উসকে দিল। সাগর জানতে পারলেন যে তাকে মারধোর করা হবে এবং তাকে বিচার-শালিসের সম্মুখীন করা হবে। এ কথা জানতে পেরে তিনি তার নানাকে ধর্মব্যবসা সম্পর্কে জানান ও প্রামাণ্যচিত্রটি দেখান। নানাও বুঝতে পারেন যে, হেযবুত তওহীদ প্রচলিত বিকৃতির বেড়াজাল থেকে মুসলিম জাতিকে মুক্ত করতে চাচ্ছে। নানার হস্তক্ষেপের কারণে আর তাকে মারধোর বা বিচার-শালিসের মুখোমুখি হতে হয় না। কিছুদিন পর তার বাসায় চরমোনাই পীরের ১০-১৫ জন মুরিদ আসে এবং তাকে তালাশ টিমের অপপ্রচারমূলক ভিডিও দেখায়। ভিডিওটি দেখানোর মাধ্যমে তারা সাগরকে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে উসকে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সাগরকে তারা সত্যের পথ থেকে ফেরাতে ব্যর্থ হয়।

সাগর ধর্মজীবিকার আরাম আয়েশের জীবনকে ত্যাগ করে ছোটখাটো পণ্য হকারী করে জীবনধারণ করতে শুরু করেন। এরফলে তার পরিবরের লোকজন তাকে অবজ্ঞা করে এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করে। স্বামী আলেম এই ভেবে যে স্ত্রী তার প্রতিটি কথা কোর’আনের অক্ষরের মত সত্য বলে মেনে নিত, যে স্ত্রী তার আরাম আয়েশের জন্য সকল প্রকার কষ্ট সহ্য করতো সেই স্ত্রী আজ তিনি হেযবুত তওহীদ করেন বলে তার সাথে রাত-দিন ঝগড়া করে, তার খাবার-দাবারের প্রতি খেয়াল রাখে না এমনকি এমনও দিন যায় লাগাতার তিন-চারদিন সাগরকে বাসায় খাবার দেয়া হয় না। তথাপি তিনি সত্যের উপর অটল আছেন। তিনি যে আলোর সন্ধান পেয়েছেন সেই আলোই তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং তাকে পূর্বের সম্মানের চেয়ে অনেক বেশি সম্মান প্রদান করবে এটিই তার বিশ্বাস।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ