তারা কেন সব মৃত্যুতেই মর্মাহত হন না?

মোহাম্মদ আসাদ আলী
কয়েকদিন ধরেই বাতাসে গুঞ্জনটি শোনা যাচ্ছিল। সিরিয়ায় নাকি হামলা হবে! প্রথমে বিষয়টাকে মোটেও গুরুত্ব দিইনি। গুরুত্ব না দেবার উপযুক্ত কারণও ছিল। সিরিয়ায় নতুন করে হামলার কী আছে? এই দেশটি তো ২০১১ সাল থেকেই আছে হামলার উপরে। সরকার হামলা করে বিদ্রোহীদের ওপর। বিদ্রোহীরা হামলা করে সরকারের ওপর। আবার জঙ্গিরাও গেড়েছে শক্ত ঘাঁটি। তাদের অপার কৃপা। কারো উপর হামলা করতেই আপত্তি নেই তাদের। সামনে যাকে পাচ্ছে তার উপরেই হামলে পড়ছে। তাদের উপর আবার হামলা করে পশ্চিমারা। কিন্তু দিনশেষে সরল সত্যটি এই যে, আদতে সমস্ত হামলাই হচ্ছে ‘সিরিয়া’র ওপর। ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে ছোট্ট একটি ভূখণ্ড এই সিরিয়া। মানচিত্র নিয়ে বসলে সহজে চোখেই পড়ে না। অথচ এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া। বিষয়টা আমাকে অবাক করে।
গত ১৪ এপ্রিল সকালে ঘুম থেকে জেগেই শুনতে পাই- সিরিয়ায় হামলা হয়েছে। মিসাইল হামলা। অর্থাৎ গুঞ্জন সত্য ছিল। গণমাধ্যমের ভাষ্য যদি নির্ভুল হয়ে থাকে তাহলে ওই হামলায় সিরিয়ার সরকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বহু স্থাপনা ধ্বংস হবার কথা। তিনটি বড় দেশ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স যৌথভাবে এই হামলা চালিয়েছে। এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই তিন শক্তির দুইটিই এককালের ঔপনিবেশিক শক্তি। সময় বদলেছে, কিন্তু তাদের ঔপনিবেশিক চরিত্র এখনও আগের মতই আছে। আমার মনে হয় সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সক্ষা সর্বদা তাদের মনের মধ্যে আঁচড় কাটতে থাকে। তাই যেখানেই ভূরাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয় সেখানেই তারা হাজির হয়। নাকি যেখানে তারা হাজির হয় সেখানেই সঙ্কট তৈরি হয়? যারা খুব আন্তর্জাতিক রাজনীতি বোঝেন তারা হয়ত সঠিক জবাবটা দিতে পারবেন।
আমি সরল দৃষ্টিতে যা দেখছি তা হচ্ছে, এই পরাশক্তিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে নব্য উপনিবেশবাদী যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রবল প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট তিনি। তার ব্যাপারে নতুন করে বলার কিছুই নেই। বঙ্গোপসাগরে প্রচণ্ড ঝড় উঠলে আমরা হয়ে পড়ি নিরুপায়। ‘ওই ঝড়ের প্রকোপ একটুখানি কমবে, দু’টো মানুষ কম মারা যাবে’- এই প্রার্থনা করা ছাড়া উপায় থাকে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন প্রেসিডেন্ট হলেন সেদিনই পৃথিবীর মানুষ দশ নম্বর বিপদসংকেত পেয়ে গেল। এখন কেবল প্রার্থনা- যেন দু’টো দেশ কম ধ্বংস হয়, পরমাণু যুদ্ধ লেগে না যায়। সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত একজন ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ প্রেসিডেন্টের নজর সিরিয়ায় পড়েছে। আমি যথেষ্টই শঙ্কিত।
পাঠকরা আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। তারা প্রশ্ন করতে পারেন, ‘আপনি এই হামলার সমালোচনা করছেন কেন? হামলার কারণটা তো অযৌক্তিক নয়। নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে। ব্যবহার করেছে সিরিয়ার সরকার (বিদ্রোহীরা করেনি তার গ্যারান্টি কী?)। নারী-শিশু নির্বিশেষে বহু বেসামরিক মানুষ ছটফট করে মারা গেছে। সেই রাসায়নিক অস্ত্রের গোদাম ধ্বংস করার জন্যই হামলা। এখানে দোষের কী আছে?’
এই প্রশ্নের জবাব আমি দিব না, কারণ তার প্রয়োজন নেই। জবাব পাঠকরাই খুঁজে পাবেন সিরিয়ার গত সাত বছরের ঘটনাপ্রবাহে। আমি কেবল সংক্ষেপে সেই ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরব:
২০১১ সালের ঘটনা। সিরিয়া সঙ্কটের শুরু হলো আরব বসন্তের গর্ভে। তখন ‘আরব বসন্ত’ শব্দটা পত্র-পত্রিকায় ও টেলিভিশনে খুব শোনা যেত। পাঠকও নিশ্চয়ই শুনেছেন। এখন কিন্তু সেটা ভাসুরের নাম হয়ে গেছে, কেউ মুখে আনতে চায় না। এর কারণ বোঝা কঠিন নয়। আরবে কোনো বসন্তের দেখা পাওয়া যায়নি- এটাই কারণ। পশ্চিমা গণমাধ্যম যেটাকে ‘বসন্ত’ বলে বোঝাবার চেষ্টা করেছে, দেখা গেল ওটা ‘কালবৈশাখী ঝড়’। সিরিয়ায় যখন এই ঝড় শুরু হলো তখনকার দৃশ্য আমার চোখে ভাসে। শুরুতেই সিরিয়া হলো দুইভাগ। একদিকে সরকারি শক্তি, অপরদিকে সরকারবিরোধী। কোনো এক রহস্যময় উপায়ে বিরোধীদের হাতে উঠে এলো অস্ত্র এবং মাথার উপরে নেমে এলো পশ্চিমা আশীর্বাদ। কারো বুঝতে বাকি রইল না বিদ্রোহীরা অস্ত্র পাচ্ছে কোথায়। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কারা এবং কী তাদের উদ্দেশ্য।
উদ্দেশ্য আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল- যখন দেখা গেল আরব বসন্তের নামে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান সব দেশে হলো না। বেছে বেছে কেবল সেই দেশগুলোতেই ভয়ংকর রূপ নিল যে দেশগুলোর সাথে পশ্চিমাদের শত্রুতার সম্পর্ক। সৌদি আরবের মত দেশে এই ঝড়ের প্রকোপ বেশি হবার কথা, কিন্তু সেখানে কোনো বসন্ত এলো না। কারণ রিমোট কন্ট্রোল পশ্চিমাদের হাতে। পশ্চিমারা যেই সরকারগুলোকে শত্রু মনে করল সেখানেই সরকারবিরোধী হাওয়া লাগলো। যৌক্তিক কারণেই লিবিয়া-সিরিয়ায় সেই হাওয়া ভয়াবহ ঝড়ের আকার ধারণ করল। সশস্ত্র বিদ্রোহীরা যুদ্ধ আরম্ভ করল সরকারি বাহিনীর সাথে। লিবিয়ার পতন হলো। সিরিয়া টিকে থাকল। শুরু হলো গৃহযুদ্ধ। যুদ্ধের মধ্যেই চলতে লাগল ভাগাভাগী। সিরিয়ার একেক এলাকা চলে গেল একেক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে।
এরপর যত দিন গেছে দেশটিতে কালবৈশাখীর তাণ্ডব বিস্তৃত হয়েছে। কে যে কাকে মারছে, কারা কিসের লক্ষ্যে লড়াই করছে বোঝা মুশকিল। শুধু বোঝা যাচ্ছে একটি বিষয়- সিরিয়া নামক বেদিতে ‘মানুষের মৃত্যুযজ্ঞ’ আরম্ভ হয়েছে। সিরিয়ার বাতাস বারুদের গন্ধ চায়। সিরিয়ার মাটি লাশ চায় এবং অবশ্যই নিরীহ বেসামরিক মানুষের লাশ। সরকার বা বিদ্রোহী বা জঙ্গি বা আমেরিকা বা রাশিয়া- কোনো এক পক্ষের হাতে মরলেই হয়। এই যজ্ঞে মৃত্যু হওয়াটাই যেন বড় কথা। এর জন্যই এত আয়োজন। দুনিয়ার বুকে স্থাপিত হয়েছে মিনি জাহান্নাম। বিভিন্ন অস্ত্রধারী গ্রুপ সেই জাহান্নামের প্রহরী। কোনো এক অজানা পাপের শাস্তি ভোগ করছে দেশটার সাধারণ জনগণ।
এরই মধ্যে আইএসের উপাখ্যান রচিত হয় এবং লক্ষ মানুষের প্রাণের আহুতিতে সেই উপাখ্যান সমাপ্ত হয়। আমি লজ্জিত হই আইএস ইস্যুতে পশ্চিমাদের নির্লজ্জতা দেখে। পশ্চিমারা বিদ্রোহীদের সমর্থন দিল (এখনও দিচ্ছে)। সেই সমর্থন পেয়ে মোটাতাজা হলো আইএস। তাদেরকে ইচ্ছেমত বাড়তে দেওয়া হলো। চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হলো। তারপর যখন ইরাক-সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আইএসের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল, তখন হঠাৎ পশ্চিমারা উপলব্ধি করল- এরা জঙ্গি! এদেরকে নির্মূল করতে হবে- যে কোনো উপায়ে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শুরু হলো আইএস নির্মূল অভিযান। সেই বিখ্যাত গানের চরণ- ‘তুমি হাকিম হইয়া হুকুম কর পুলিশ হইয়া ধর।’
পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো তাদের জাত চেনাতে লাগলো। আইএস নির্মূল করতে গিয়ে তারা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়িও নির্মূল করে ফেলল। পাঠকরা কি তখন ঘুনাক্ষরেও ভেবেছিলেন- আইএস নির্মূলের নামে পশ্চিমা শক্তিগুলোও বর্বরতায় মেতে উঠবে? চাকু দিয়ে শিরোশ্ছেদ করার চাইতে বোমা মেরে বাড়িসুদ্ধ মাটিতে গেড়ে দেওয়া কম অমানবিক নয়। পৃথিবীর কোনো জনগোষ্ঠীকে যেন এমন অমানবিকতার সাক্ষী হতে না হয়। আমার ধারণা ইরাক/সিরিয়ার জনগণ পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে রোজ একটি প্রার্থনা করেন। সেটা হচ্ছে ‘হে আল্লাহ, পৃথিবীর কোনো জাতিকে যেন পশ্চিমা সাহায্য নিতে না হয়!’
পরিহাসের বিষয়- পশ্চিমা সাহায্য আবারও নিতে হচ্ছে এবং নিতে হচ্ছে সিরিয়ার জনগণকেই। সিরিয়ার জনসাধারণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে সাম্রাজ্যবাদী নাটের গুরুদের কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ। রাসায়নিক অস্ত্রে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করার ঘটনায় তারা নাকি ভীষণ মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ! তাই একজোট হয়ে হামলা চালিয়ে অন্যায়ের জবাব দিচ্ছে। কিন্তু তাদের কৃত অন্যায়ের জবাব দিবে কে? রাশিয়া? এই রাশিয়া আরেক দানবীয় শক্তি। সে মানবকে বাঁচাতে আসেনি। নিজের ভাগ বুঝে নিতে এসেছে। তার বুকেও সমান রক্ততৃষ্ণা। তার ভাগ তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেই সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। তখন দানবে দানবে হ্যান্ডশেক হবে। জঙ্গিদের হাত থেকে মানুষকে মুক্ত করা যেমন তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, তেমনি রাসায়নিক অস্ত্রের হাত থেকে নিরাপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াও তাদের উদ্দেশ্য নয়। যদি তাদের মধ্যে সেই চেতনা থাকত তাহলে সিরিয়া সঙ্কটের জন্মই হত না। তাদের উদ্দেশ্য আমার কাছে দিবালোকের মত পরিষ্কার। তারা রক্ত চায়, মুসলমানের রক্ত। তারা সম্পদ চায়, মুসলমানের সম্পদ। তারা ধ্বংস চায়, মুসলমানের ধ্বংস। কোনো মুসলিমপ্রধান দেশের অতি ক্ষুদ্র সঙ্কটকেও তারা ধ্বংস পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এটাই তাদের পলিসি। তাদের বন্দুকের নল ঘুরেছে মুসলিমদের দিকে।
আমরা বোকা মুসলিম! আমাদেরকে যারা ধ্বংস করতে মরিয়া, আমরা তাদের কাছেই ন্যায়বিচার আশা করি। তাদের ন্যায়ের বাণী কপচানো দেখে বিভ্রান্ত হই- ‘ওরা বোধহয় আমাদের বাঁচাবে’। কিন্তু ইতিহাসের প্রমাণিত অধ্যায়ে চোখ বুলাই না। দেখেও না দেখার ভান করি যে, এই পরাশক্তিরা ন্যায়ের পক্ষে ততক্ষণ, ন্যায় তাদের পক্ষে যতক্ষণ। যখনই ন্যায়ের দাবি তাদের স্বার্থের প্রতিক‚লে চলে যায়, তারা স্বরূপে আবির্ভূত হয়। ন্যায়কে পদদলিত করতে বিলম্ব করে না। এর বহু নমুনা দেখা যায়। সিরিয়ার সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে বড় অপরাধ করেছে, এখন পশ্চিমারা দেখছে এখানে ন্যায়ের বাজারদর বেশি। ন্যায়ের পক্ষ নিলে তাদের লাভ। তাই নিরীহ মানুষের মৃত্যুতে তাদের হৃদয়ে লেগেছে শোকের ঢেউ। এই অজুহাতে সিরিয়ার সরকারকে হামলা করে দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ এই সিরিয়ারই প্রতিবেশি দেশ ফিলিস্তিন। সেখানে পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট ইজরাইলী সেনারা কিছুদিন আগেও নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের বুকে গুলি চালিয়েছে। এই মৃত্যুতে তাদের কোনো শোক নেই, তাদের হৃদয়ও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেনি। কারণ ওখানে ন্যায় লাভজনক নয়, অন্যায় লাভজনক!
নিরীহ মানুষের মৃত্যু নয়, ন্যায়-অন্যায় নয়, লাভ-ক্ষতির পাল্লায় নির্ধারিত হয় তাদের কর্মপন্থা। একটি প্রাণের চাইতে একটি বুলেটের মূল্য তাদের কাছে অনেক বেশি। সেই বুলেট তারা মুসলমানদের স্বার্থে ব্যবহার করবে- এটা কেবল বোকাদের পক্ষেই ভাবা সম্ভব!
লেখক: কলামিস্ট।
facebook/asadali.ht

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ