খানকার চার দেয়ালের অভ্যন্তরে কামেলিয়াত নেই

মসীহ উর রহমান:
আদম (আ.) থেকে শেষ নবী (সা.) পর্যন্ত আল্লাহ যুগে যুগে তওহীদভিত্তিক দীনগুলো পাঠিয়েছেন একটা ভারসাম্য দিয়ে। প্রত্যেকটিতে একদিকে যেমন মানুষের জন্য রাজনীতিক ও আর্থ-সামাজিক বিধান রয়েছে-তেমনি তার আত্মার উন্নতির প্রক্রিয়াও রয়েছে। দু’দিকেই সমান এবং একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা একেবারে অচল। মানুষ যেমন দুপায়ে চলে, এক পায়ে চলতে পারে না, দীনও একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা একা চলতে পারে না। কাজেই ইসলামেও তাসাওয়াফের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। কিন্তু সেই তাসাওয়াফ কোন তাসাওয়াফ? বর্তমানে তাসাওয়াফের যে রূপ আমরা দেখে থাকি সেটা ইসলামের তাসাওয়াফ নয়। আত্মার উন্নতির প্রক্রিয়া পূর্ববর্তী সমস্ত দীনেই ছিল, বিকৃত অবস্থায় আজও আছে এবং ঐ পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর প্রক্রিয়ায় সাধনা করলে আজও ফল পাওয়া যায়। আজও অন্যান্য ধর্মে অতি শক্তিশালী মহা সাধকরা আছেন যাদের কেরামত অলৌকিক ক্ষমতা মুসলিম ওলী, আওলিয়াদের চেয়ে কম নয়। যে কেউ-ই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সাধনা করলে তার ফল পাবে, তার আত্মার শক্তি বৃদ্ধি পাবে, অদৃশ্যের, গায়েবের অনেক খবর তার কাছে আসবে, সাধারণ মানুষ যা পারে না তেমন কাজ করার ক্ষমতা জন্মাবে, এক কথায় তাসাওয়াফের বই-কেতাবে যে সব উন্নতির কথা লেখা আছে সবই হবে। কিন্তু এগুলি শেখাতে বিশ্বনবী (সা.) আসেন নি। এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফী ও আলেম, হাকীম-আল-উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী (র.) লিখেছেন- “মানব শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যেমন জাহিরী (প্রকাশ্য) শক্তি রহিয়াছে। সেইরূপে মানুষের রূহের (আত্মার) মধ্যে অনেক বাতেনী (গুপ্ত) শক্তি নিহিত আছে। শরীর চর্চার মাধ্যমে যেমন মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গ শক্তিশালী হইয়া উঠে, তদ্রƒপ আধ্যাত্মিক সাধনার দ্বারা তাহাদের রূহানী শক্তি বৃদ্ধি পায় (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ- ইসলামিক ফাউণ্ডেশন-১ম খণ্ড ৭৬ পৃঃ)। আশরাফ আলী থানভী প্রকৃত সত্য কথা লিখেছেন এবং সে সাধনার কথা লিখেছেন যে সাধনার প্রক্রিয়া প্রতিটি ধর্মেই আছে। কিন্তু শুধু এই প্রক্রিয়া শেখাতে শেষনবী (সা.) আসেন নি। কাজেই ইসলামের প্রকৃত তাসাওয়াফ জানা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। ইসলামে তাসাওয়াফ হচ্ছে যখনই কোনো কাজ করা হবে তখন মনে রাখতে হবে এই কাজটি আল্লাহর অনুমোদিত কিনা, যদি আল্লাহ ও রসুলের অনুমোদিত হয়ে থাকে তাহলে সেটা করা আর যদি আল্লাহ রসুলের নিষিদ্ধ হয়ে থাকে সেটা না করা। অর্থাৎ কাজটি করা অথবা না করা এবং সেটা হবে আল্লাহর আদেশ বা নিষেধ মোতাবেক। হুকুম দেয়ার একমাত্র অধিকারী আল্লাহ কারণ সার্বভৌমত্ব হলো আল্লাহর। রসুলের কথা বলার কারণ রসুল আল্লাহর হুকুমের বাহিরে হুকুম দিতে পারেন না (সুরা হাক্কা- ৪৬, সুরা নজম ৩-৪)। আল্লাহর হুকুমের কোনটার কি মানে সেটা হলো রসুলের জীবনীতে অর্থাৎ রসুলের কথায়। সুতরাং ইসলামের আধ্যাত্মিকতার শুরু হলো এখান থেকে। এটা করতে করতে কে কত উচ্চে উঠতে পারে, নিখুঁত হতে পারে সেটা যার যার আমল। এটাকেই আল্লাহ বলেছেন আমার যেকর, সকাল সন্ধ্যা তাঁর যেকর এ রত থাকা (সুরা আল আহযাব-৪১, ৪২)। অন্যভাবে বলা যায় তাকওয়া। জান্নাতে স্তর নির্ধারিত হবে এই তাকওয়া বা যেকরের উপর নির্ভর করে। বর্তমানে আধ্যাত্মিকতার নামে যে সূফিবাদ চালু আছে সেটা আল্লাহ ও রসুলের নয়। মুমিনদের মধ্যে যিনি আল্লাহর হুকুমের ব্যাপারে যত সচেতন, যত বেশি মোত্তাকী তিনি তত বড় আধ্যাত্মিক সাধক। গাছের নিচে, ঝোপ ঝাড়ে বসে, গুহায়, খানকায় বসে অধ্যাত্ম অর্জন শেষ ইসলামের অধ্যাত্ম নয়। আজকের আধ্যাত্মিক সাধকদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ষড় রিপুকে দমন করে আত্মার উন্নতি সাধন। এখানে ষড়রিপু সম্পর্কে দুইটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। প্রথম ধরুন ‘লোভ’। লোভ হলো মানুষের ষড়রিপুর একটি রিপু। লোভ মানুষকে হীন পশুতে পরিণত করে দিতে পারে। একজন সাধক চোখ বন্ধ করে, না খেয়ে, আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যেমন হয়তো সে ৫০ বছরে কেবল লোভ থেকে মুক্ত হলো (যদিও আদৌ ১
০০% সম্ভব কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে)। অন্যদিকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ডাক যখন আসে একজন মুমিন মুজাহিদ সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়ি, ঘর, সহায় সম্পত্তি, আত্মীয় পরিজন, বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে জিহাদে অংশগ্রহণ করে, অতঃপর সেখানে অবশেষে নিজের জানটুকু পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় কোরবান করে শহীদ হয়ে যায়। তাহলে লোভ থেকে, মোহ থেকে, ক্রোধ থেকে, ভোগের বাসনা থেকে ১০০% মুক্ত হয়ে গেল, কামেলিয়াত অর্জন কোরল, নিশ্চয় ঐ মুজাহিদ। একজন মুজাহিদ জিহাদ করে প্রথমত মানবজাতির কল্যাণের জন্য, আল্লাহকে বিজয়ী করার জন্য, পক্ষান্তরে সাধু, ফকীর, দরবেশ জুহুদ বা আত্মিক সাধনা করে একান্তই নিজের জন্য, স্বীয় আত্মিক পরিতৃপ্তি ও পরিশুদ্ধির জন্য। প্রশ্ন হলো বছরের পর বছর ধরে যে সাধক জুহুদ করে অর্থাৎ সাধনা করে একটা একটা করে রিপু জয় করতে চেষ্টা করল কিন্তু কোনটা থেকেই হয়তো পুরোপুরি মুক্ত হতে পারলনা সেখানে একজন মুজাহিদ কিভাবে সমস্ত কিছু বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে একসঙ্গে সকল ষড়রিপু থেকে পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে সর্বোচ্চ কামেলিয়াত হাসিল করল। এর সহজ উত্তর, এটা মহান আল্লাহ করে দিয়েছেন কারণ সে আল্লাহকে বিজয়ী করার জন্য আত্মনিয়োগ করেছে। এখানে একটা কথা প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এই সুন্দর পৃথিবী আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন বনী আদমের জন্য, বনী আদম আল্লাহর খেলাফত করবে, এখানে তারা শান্তিতে থাকবে, দুনিয়ার আলো বাতাস, খাদ্য পানীয় ইত্যাদি ভোগ করবে, বংশ বৃদ্ধি করবে, দুনিয়া চাষাবাদ করবে এটাই হলো স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যদি কাম প্রবৃত্তি দমন করতে থাকে, পাহাড়ে জঙ্গলে বসে সংসার না করে জীবন অতিবাহিত করে তাহলে মানবজাতি একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আজকের তাসাওয়াফ চর্চাকারীদের প্রতি কয়েকটি প্রশ্ন এখানে প্রাসঙ্গিক: ক) যদি নারী পুরুষ বৈবাহিক জীবন যাপন না করে তাহলে আল্লাহ নারীদের সৃষ্টি করলেন কেন? খ) বনী আদমের বংশ বৃদ্ধি হবে কিভাবে, আল্লাহর খেলাফত কে করবে? গ) সমস্ত মানবজাতির পক্ষে কি এসব তরিকা অবলম্বন করা সম্ভব? যদি সম্ভব না হয় তবে তা সার্বজনীন নয়। আর যা সার্বজনীন নয় তা ইসলাম হতে পারে না। ঘ) তাছাড়া আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের উপর তোমাদের নফ্সের হক রয়েছে। নফল সওম রাখো এবং তা থেকে বিরত থাকো। রাতের বেলা তাহাজ্জুদের সালাহ কায়েম করো এবং ঘুমাও। আমি তাহাজ্জুদের সালাহ কায়েম করি এবং ঘুমাইও। কোনো কোনো সময় সওম রাখি। আবার কোনো কোনো সময় সওম ত্যাগও করি। গোশত খাই, চর্বিও খেয়ে থাকি। স্ত্রীদের নিকটও যাই। যে আমার সুন্নাহ ত্যাগ করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ শরীরকে বঞ্চিত করাকে তিনি জুলুম বা অন্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং এই কথা পরিষ্কার যে, ইসলামের অধ্যাত্মবাদ হলো প্রত্যেক কাজে আল্লাহর উপস্থিতি গণ্য করা অর্থাৎ এটা মনে করা যে আমার এই কাজ আল্লাহ দেখছেন এবং আল্লাহর আদেশ নিষেধ অনুযায়ী সেই কাজ করা বা না করা। যে এটা যত বেশি স্মরণে রেখে জীবন অতিবাহিত করল সে তত বড় কামেল, তত বড় মোত্তাকী। এই হলো প্রকৃত ইসলামের তাসাওয়াফের সাথে বর্তমানের বিকৃত এবং ইসলাম বিবর্জিত তাসাওয়াফের পার্থক্য।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ