কোর’আন হলো ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড

মুস্তাফিজুর রহমান শিহাব:
ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার মানবসমাজে নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু সমস্যা হলো অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসী মানুষই এটা বুঝতে সক্ষম নন যে কোনটা ধর্মের সঠিক ব্যবহার আর কোনটা অপব্যবহার। ধর্মের একটা আবরণ জড়িয়ে দিলেই সে বিষয়ে মানুষের ভক্তিশ্রদ্ধা উপচে পড়ে আর সেই সুযোগে স্বার্থ হাসিল করে নেয় বিভিন্ন ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এভাবে ধর্মের নাম করে সম্পূর্ণ বিপরীত মুখে মানুষকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। যেমন রাজনৈতিক ইসলাম ও সুফিবাদ এই দুটো দৃশ্যমান বিপরীত বিষয় ইসলামের নাম দিয়েই চালানো হচ্ছে এবং এই দুটো বিপরীত মেরুতে লক্ষ কোটি মুসলিম নিজেদের ঈমানকে সমর্পণ করে আছে।
ইসলামের নামে কোনো কিছু করতে হলে কোর’আন দেখানো হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। কারণ শেষ আসমানী গ্রন্থের অবিকৃত থাকার বিষয়টি সত্য এবং এটি আল্লাহর বক্তব্যের সবচেয়ে অকাট্য দলিল। যারা জঙ্গিবাদী আদর্শ প্রচার করতে চান তারা কোর’আনের জেহাদ-কেতাল সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে সামনে নিয়ে আসেন। যারা মডারেট ইসলাম প্রচার করতে চান তারা আবার সেই আয়াতগুলোকে পেছনে ফেলে সামনে আনেন উপদেশমূলক আয়াতগুলোকে। যারা সুফি তরিকার অনুসারী তারা বিভিন্ন রূপক ও অস্পষ্ট আয়াতগুলোকে সামনে এনে তার গূঢ় অর্থ মনগড়াভাবে ব্যাখ্যা করে স্বীয় তরিকার উপর আস্থা বৃদ্ধি করেন। আর যারা ইসলামকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশদের তৈরি পন্থায় রাজনীতিতে নেমেছেন তারা কোর’আনকে সংবিধান, শরিয়াহর গ্রন্থ ইত্যাদি বলে পরিচিত করতে চান।
কিন্তু এগুলো সবই উদ্দেশ্যমূলক নামকরণ যার দ্বারা বহু প্রতারিত মানুষ তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। বস্তুত, সংবিধান বলতে বোঝায় একটি রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রকে। যে কেউ একটি দেশের সংবিধান ও পবিত্র কোর’আন এই দুটো গ্রন্থকে পাশাপাশি পড়ে গেলে নিজেই বুঝতে পারবে যে কোর’আন আদতে কোনো সংবিধান নয়। তবে এটা সত্য যে কোর’আনে বিশ্বব্যবস্থার কিছু মূলনীতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোর’আন কোনো আইনের বই না, কোর’আনকে দণ্ডবিধির বইও বলা চলে না। তবে হ্যাঁ, কোর’আনে কিছু কিছু আইন কানুন আছে, কিছু আয়াত দণ্ডবিধির মধ্যেই পড়ে। কিন্তু মোটের উপর কোর’আন ওসবের একটাও নয়। কোর’আনে বিশ্বপ্রকৃতি ও মহাকাশ সংক্রান্ত বহু আয়াত আছে যা বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্যে পূর্ণ কিন্তু তাই বলে কি কোর’আন বিজ্ঞানের বই? না। কোর’আন কোনো ইতিহাসের বইও নয়, যদিও কোর’আনে অতীতের বহু জাতির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
‘কোর’আন কী’ সে প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন। বলেছেন এটা উপদেশগ্রন্থ। আবার কোর’আনকে বলা হয়েছে ‘ফোরকান’ অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা পার্থক্যকারী গ্রন্থ। বলা হয়েছে কোর’আনুল কারীম অর্থাৎ যেটা পুনঃপুনঃ পাঠ করা হয়। কারণ যেন মানুষ কোর’আনের মূল্যবোধকে সদাসর্বদা স্মরণে রেখে কাজ করতে পারে। কাজেই আল্লাহ যেটুকু বলেছেন আমরা কোর’আনকে আধুনিক রাজনীতির মোড়ক পরাতে গিয়ে যেন তার বাড়াবাড়ি না করে ফেলি।
যারা কোর’আনের শরিয়া প্রতিষ্ঠা নিয়ে তুলকালাম করেন তাদেরকে একটা প্রশ্ন করা দরকার যে, কোর’আনে কয়টা আইনের কথা আছে? কোর’আনে কয়টা রাষ্ট্র পরিচালনার ধারা-উপধারা আছে? কোর’আনে কয়টা দণ্ডবিধি আছে? চুরি, ব্যাভিচার আর হত্যার বাইরে সমাজে হাজার হাজার অপরাধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেগুলোর শাস্তি কী হবে? আবার চুরির বিধান হাত কাটাই ধরুন। বাপের মানিব্যাগ থেকে ছেলের দশ টাকা চুরিও চুরি, রিজার্ভের আটশ’ কোটি টাকা চুরিও চুরি, উভয়ের শাস্তিই কি হাত কাটা? এবার তারা শরীয়তের বই হাজির করবে। অথচ আপনি হয়ত জানেন না সেই শরীয়তের বই আল্লাহর নাজেলকৃত গ্রন্থ নয়। সেটা আজ থেকে শত শত বছর পূর্বের একদল আলেমের রচিত গ্রন্থ, যারা তাদের পারিপার্শিক অবস্থা, স্থান, কাল ইত্যাদি বিবেচনা করে সেই সময়ের মানুষের জন্য প্রযোজ্য বিধি-বিধান রচনা করেছিলেন। সেটা কী করে কোর’আনের আইন হয়? সেটা বড়জোর আলেমদের আইন হতে পারে। বর্তমানের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে, বিশ্ব যখন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখী হচ্ছে, তখন হাজার বছর আগের মুফতি-ফকিহদের ঐ বিধান কতটুকু প্রযোজ্য হতে পারে? কিন্তু “আল্লাহর আইন চাই” বলে সেই পুরোনো আমলের শরীয়তের কেতাবগুলোকেই জাতির উপর চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়, আর তা দেখে যুগসচেতন মানুষরা ইসলামকেই ভুল বোঝেন। যে আইনটি আলেমদের অর্থাৎ মানুষের তৈরি করা সেটা কী করে শ্বাশ্বত চিরন্তন আইন হতে পারে? আল্লাহর হুকুম হলো শ্বাশ্বত, কিন্তু আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে যেটা রচিত হয়েছে সেটা অবশ্যই স্থান-কাল-পাত্রের দ্বারা সীমাবদ্ধ।
সত্য হচ্ছে কোর’আন ন্যায় ও অন্যায়কে বুঝতে শেখায়। সত্য থেকে মিথ্যাকে পৃথক করে দেয়। ব্যস, এবার মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে সে তার সামগ্রিক জীবনে সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়কে প্রাধান্য দেবে। কোনো বিধান সেটা প্রয়োগের ফলে চূড়ান্ত বিচারে মানুষ ন্যায় পাচ্ছে নাকি অন্যায় পাচ্ছে? যদি ন্যায় পেয়ে থাকে তাহলে সেটাই ইসলামের আইন। আর যদি সে আইনের দ্বারা অন্যায়ের বিজয় হয় তাহলে সেটা তাগুতের আইন। কোনো রাষ্ট্র, সেটার গঠন যদি এমন হয় যে তার দ্বারা চূড়ান্ত বিচারে ন্যায় ও সত্যের প্রকাশ ঘটে, রাষ্ট্র পরিচালকরা ন্যায়ের উপর দণ্ডায়মান থাকেন এবং জনগণ ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি পায় তাহলে সেটাই ইসলামী রাষ্ট্র। অপরাধীকে দণ্ডবিধির যে ধারায় শাস্তি দিলে ন্যায়ের বিজয় হয় সেটাই ইসলামী দণ্ডবিধি। আল্লাহ কেবল বড় বড় কয়েকটা অপরাধ- যেমন, চুরি, ব্যভিচার, হত্যা ইত্যাদির শাস্তি দানের ক্ষেত্রে সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ওই পর্যন্তই। চুরির শাস্তি বড়জোর হাত কাটা পর্যন্তই। তার বেশি নয়। তবে নিম্নে যতদূর ইচ্ছা শাস্তি কমিয়ে দেওয়া যায় অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে, এমনকি ক্ষমাও করা যায়। এই সীমারেখা নির্ধারিত না থাকলে কী হতে পারে তার দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজেই তো আছে। সামান্য চুরির দায়ে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। যেখানে কোর’আনের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠত থাকবে, সেখানে কস্মিনকালেও এমন হবার নয়। একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ নিজে সত্য, আর সত্য থেকেই আসে ন্যায়। কাজেই ন্যায়ের স্থাপনা হওয়া মানেই আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হওয়া, কোর’আনের শাসন কায়েম হওয়া। তবে আল্লাহর হুকুমের বাইরে গিয়ে, তাঁর দেখানো নীতিমালাকে অস্বীকার করে কোনোদিন মানুষ এমন কোনো বিধান রচনা করতে পারবে না যা দিয়ে তাদের সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। গত কয়েক শতাব্দী জীবনবিধান নিয়ে মানুষ বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও শান্তি লাভ করতে পারে নি, বরং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটমুহূর্তে এনে মানবজাতিকে দাঁড় করিয়েছে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও তাদের সামনে এখন একটাই পথ, আল্লাহর হুকুমের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করা।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ