কোর’আনে যা হারাম তা ইজমা-কিয়াস করে হালাল করা হয়েছে

রিয়াদুল হাসান
দীনের কাজ করে টাকা নেওয়া যাবে কিনা এ প্রশ্ন করলে আলেম সাহেবরা বলে থাকেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি জায়েজ না থাকলেও পরবর্তী যুগের আলেম-ওলামা ও ফুকাহাদের মত হলো ইমামতি, মুয়াজ্জিনী, দীনী শিক্ষকতা, ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল, কবর জেয়ারত ইত্যাদি করে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ আছে। ৫ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে বাংলা নিউজে প্রকাশিত “ওয়াজের জন্য চুক্তি করে টাকা নেওয়া জায়েজ নেই” শিরোনামের একটি প্রবন্ধে মুফতি আবুল হাসান শামসাবাদী লিখেছেন, “অনেকে ওয়াজকে মাদরাসার শিক্ষকতা কিংবা মসজিদের ফরজ নামাজের ইমামতির সঙ্গে তুলনা করে ওয়াজের জন্য চুক্তি করে টাকা নেওয়াকে জায়েজ করতে চান। কিন্তু এটা ঠিক নয়। মাদরাসার শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমামের ওপর বক্তাকে কিয়াস (কোর’আন, হাদিস বা ইজমার কোনো দলিল দ্বারা প্রমাণিত কোনো বিষয়ের ওপর অনুমান করে এই তিন উৎসে নেই এমন কোনো বিষয়ে মাসয়ালা নির্ণয় করাকে কিয়াস বলে) করা যাবে না। কেননা, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী যুগের আলেমরা বেতন গ্রহণকে জায়েজ বলেছেন। পরবর্তী যুগের আলেমদের পরিচয় প্রসঙ্গে ‘দুসত‚রুল উলামা’ (২/১৭৮) তে বলা হয়েছে, ৪৪৮ হিজরি থেকে ৬৯৩ হিজরি পর্যন্ত আলেমরা উলামায়ে মুতাআখখিরিন কিংবা পরবর্তী যুগের অন্তর্ভুক্ত। আর এটা এ কারণে যে, এ কাজের ওপর দীনের ইলম ও আমলের স্থায়ীত্ব নির্ভরশীল। তাই বেতন না হলে, সেই অবস্থায় কেউ এ কাজের জন্য সময় বের করতে না পারলে দীনের ইলম ও আমলের ক্ষতি হবে।”
মুফতি সাহেবের সুস্পষ্ট মত হচ্ছে – দীনের ইলম ও আমলের ক্ষতি হবে এই কারণে পরবর্তী যুগের আলেমরা দীনের বিনিময় নেওয়াকে জায়েজ করে দিয়েছেন। এই পরবর্তী যুগের আলেমদের অনেকেই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিকে নাজায়েজ বলে ফতোয়া দিলে ইসলামের খিদমত ও কোর’আনের শিক্ষা বিস্তারের কাজ নিদারুণভাবে বিঘ্নিত হবে। এ কাজ বিঘ্নিত হওয়া মারাত্মক ধরনের অনভিপ্রেত ব্যাপার যে, এর কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ক্ষুদ্রতর অনভিপ্রেত কাজ সহ্য করে নিতেই হবে। আল্লামা ইবনে আবেদীন বলেন, “পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শিক্ষাদানকে যদি অনুমোদন না করা হয়, তবে কোর’আন বিকৃত ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।” [রদ্দুল মুখতার – আল্লামা ইবনে আবেদিন (রহ.)]। এজন্য ইজমা কিয়াস আর ইজতেহাদ করে তারা ধর্মব্যবসাকে জায়েজ করে দিয়েছেন। খেয়াল করুন, আল্লাহর হুকুম বা রসুলের নির্দেশ নয় বরং ইজমা কিয়াস করে এ বৃত্তিকে জায়েজ করা হয়েছে। কিন্তু সেটাও যে বৈধ নয় তার প্রমাণ দেখুন। ইসলামের প্রাথমিক যুগের ফকীহ আল্লামা আবু বকর জাসসাস (মৃত্যু ৩৭০ হিজরী) তার সুবিখ্যাত আহকামুল কোর’আন গ্রন্থের ঘুষ সংক্রান্ত অধ্যায়ে লিখেছেন, “এ থেকে প্রমাণিত হয়, যে কাজ ফরজ হিসেবে অথবা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়, সে কাজে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ নেই। যেমন হজ্ব এবং কোর’আন ও ইসলাম শিক্ষাদান ইত্যাদি।” [আহকামুল কোর’আন: ২য় খণ্ড, ৫২৬ পৃষ্ঠা – আল্লামা আবু বকর জাসসাস (রহ.)]
তার পূর্বসূরি সকল ফকীহগণই পারিশ্রমিক গ্রহণ জায়েজ নেই বলেই ফতোয়া দিয়েছেন। কিন্তু তাদের কিছুদিন পরেই ৪র্থ শতাব্দীর শেষভাগে ফেকাহবিদদের কেউ কেউ ইসলামের চিরন্তন এ বিধানকে পরিবর্তন করে ফেলেন। আমরা জানি না তাদের উপর নতুন করে ওহি নাজিল হয়েছিল কিনা। ফতোয়ায়ে কাযী খান গ্রন্থে ইমাম হাফেজ আবু লায়েসের উক্তি এভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে: “ইমাম আবু লায়েস বলেন যে, আগে আমি কোর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক নেয়া নাজায়েজ বলে ফতোয়া দিতাম……….. কিন্তু এখন তা প্রত্যাহার করেছি।” [ফতোয়ায়ে কাযী খান]
ফকীহ আবু লায়েস সমরকন্দী আবু বকর জাসসাসের সমসাময়িক এবং ৩৭৩ হিজরীতে তার ইন্তেকাল হয়। স্বয়ং কাযীখানও (তাঁর পুরো নাম ফখরুদ্দীন হাসান বিন মানসুর) এটাকে জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি ৫৯২ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। আমরা সম্মানিত ফকীহদের বক্তব্য নিয়ে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যাব না। কেবল এটুকুই বলব ইসলামের হালাল-হারামের মূলনীতি হচ্ছে আল্লাহর কেতাব আর রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শ। সেখানে আমরা যা দেখি সেটাই হচ্ছে ইসলামের রূপরেখা। এর বাইরে ইসলামের মধ্যে যা কিছুর সংযোগ বা বিয়োগ ঘটেছে সেটা ইসলাম নয়। ওগুলো আঁকড়ে ধরে রাখার কোনো নির্দেশ রসুলাল্লাহ দিয়ে যান নি। বরং আমরা যেন কোনটা ইসলাম আর কোনটা ইসলাম নয় তার সুস্পষ্ট পার্থক্য করতে সক্ষম হই সেজন্য মহান আল্লাহ তাঁর পাক কালামে মানদণ্ড দিয়ে দিয়েছেন-“যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোনো সিদ্ধান্ত থাকবে সে বিষয়ে কোনো মো’মেন নারী বা মো’মেন পুরুষের ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানের এখতিয়ার থাকবে না। এবং যারাই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের অবাধ্য হবে তারাই সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত।” [সুরা আহযাব ৩৬]
সুতরাং দীনের কাজের বিনিময়ে পার্থিব স্বার্থ হাসিলকে পবিত্র কোর’আন ও হাদিসে আল্লাহ ও তাঁর রসুল সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করার পরও যারা নানাবিধ অজুহাত দাঁড় করিয়ে একে পরবর্তীকালে জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন তারা অবশ্যই আল্লাহর উপর্যুক্ত আয়াত মোতাবেক মো’মেন পুরুষ বা মো’মেন নারী নন এবং আল্লাহ ও রসুলের অবাধ্যতা করে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। যে বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহর কোনো সিদ্ধান্ত থাকে সে বিষয়ে কারো ভিন্নমত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, সেই মত যিনিই প্রদান করে থাকুক না কেন। যারা সেই মত গ্রহণ করবে তারা আদতে আল্লাহর বদলে গায়রুল্লাহকেই নিজেদের রব (প্রভু) বলে, ইলাহ (বিধাতা) বলে গ্রহণ করে নিল। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তাঁর কেতাবে আমাদের অবহিত করেছেন এই বলে যে, “তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের আলেম ওলামা আর পীরদেরকে নিজেদের প্রভু (রব) বানিয়ে নিয়েছে।” [সুরা তওবা ৩১]
‘কীভাবে আলেমদেরকে প্রভু মানা হত’ এ বিষয়ে রসুলাল্লাহকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তারা আলেমদের ইবাদত করত না, কিন্তু তারা যা হালাল করেছে তাকে হালাল করেছে এবং যা হারাম করেছে তাকে তারা হারাম বলে মেনে নিয়েছে। আর এটাই হলো তাদের ইবাদত করা।” [হাদিস: আদি ইবনে হাতিম রা. থেকে তিরমিজি] ঠিক এই কাজটিই এখন আমাদের এই মুসলিম জাতি করছে। এখন জনসাধারণের কয়জন এ বিবেচনা করেন যে, আল্লাহ যা বলেছেন তা-ই ঠিক, সেই ক্ষেত্রে কোনো আলেম-ওলামা, গাউস কুতুব, মুফতি সাহেবের কথা শুনবো না। বরং তারা এই ধ্যান-ধারণায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন যে, আলেমরা, পীর সাহেবরা যা বলেন সেটাই বুঝি আল্লাহর কথা, তারা যা বলেন সেটাই সঠিক, সেটাই ধর্ম। যদিও বাস্তবে সেগুলো আল্লাহর হুকুমের সরাসরি পরিপন্থী। ধর্মগুরুদের প্রতি এই অন্ধ আনুগত্য (তাক্বলীদ) জাতির ধ্বংসের এক অন্যতম কারণ।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ