কোর’আনের আলোকে: দীনের বিনিময় নেবার কোনো সুযোগ নেই

Diner-binemoi

মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে:

প্রতিটা দীন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যুগেযুগে এসেছে মানবতার কল্যাণের জন্য। যখন কোনো সমাজ ধর্মকে বিকৃত কোরেছে তখনই অন্যায় অবিচারে ছেয়ে গেছে মানুষের জীবন; ফলশ্রুতিতে আল্লাহ পাক নবী-রসুলদের মাধ্যমে নতুন দীন বা জীবনব্যবস্থা পাঠিয়েছেন। নবী-রসুলগণ আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত নতুন দীনটির মর্মবাণী পূর্ববর্তী বিকৃত ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে প্রচার কোরতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানাভাবে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত হোয়েছেন। নবী-রসুলগণ শতনির্যাতন ও বাধা সত্ত্বেও তাঁদের সেই সংগ্রাম অর্থাৎ তওহীদের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা চালিয়ে গিয়েছেন। অবশেষে যখন আল্লাহর সাহায্যে ঐ দীন বা জীবনব্যবস্থা উক্ত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোয়েছে তখন সমাজ থেকে সকল অন্যায় অবিচার দূর হোয়ে অনাবিল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হোয়েছে। এই দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা দীনি কাজ কোরতে গিয়ে কখনো নবী-রসুলগণ বিনিময় গ্রহণ তো করেনই নি বরং তাদের সকল সহায়-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে গেছেন, দীন প্রতিষ্ঠার পরও তাঁরা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন কোরেছেন। তাঁরা তাঁদের অনুসারীদের সাবধান কোরে গেছেন বিনিময় না নেয়ার জন্য। যতদিন ঐ ধর্মটি অবিকৃত থেকেছে ততদিন নবী-রসুলদের কোনো অনুসারীও দীনের বিনিময় গ্রহণ করেন নি। কোনো যুক্তিতেই আল্লাহ পাক ও তাঁর নবী-রসুলগণ দীনের বিনিময় নেবার কোনো সুযোগ দেন নি। সত্যের আহ্বানে বিনিময় না নিয়ে বরং ত্যাগ হোল সত্যতার একটি নিদর্শন।
দীন বা ধর্মের বিনিময় নেবার বিরুদ্ধে নবী-রসুলদের কঠিন ভূমিকার কিছু বিবরণ পবিত্র কোর’আনে বর্ণিত হোয়েছে। যেমন:
১। নূহের (আ:) এর ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! এর পরিবর্তে আমি তোমাদের নিকট ধন সম্পদ চাই না। আমার পারিশ্রমিক আল্লাহর নিকট। [সুরা হুদ-২৯, সুরা শুআরা – ১০৯, সুরা ইউনুস – ৭২]
২। হুদের (আ:) ঘোষণা: হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর পরিবর্তে তোমাদের নিকট কোনো মজুরি চাই না। আমার পারিশ্রমিক তাঁরই নিকট যিনি আমাকে সৃষ্টি কোরেছেন। তোমরা কি তবুও বুঝতে চেষ্টা কোরবে না? [হুদ-৫১, সুরা শুআরা – ১২৭]
৩। সালেহ (আ:) এর ঘোষণা: আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রোয়েছে। [শুয়ারা-১৪৫]
৪। লুতের (আ:) ঘোষণা: এর জন্য আমি কোনো মজুরি চাইনা। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। [শুয়ারা-১৬৪]
৫। শোয়েবের (আ:) ঘোষণা: আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো মূল্য চাই না। আমার মজুরি জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। [শুয়ারা-১৮০]
৬। মোহাম্মদ (দ:) এর প্রতি আল্লাহর হুকুম:
ক. এবং তুমি তাদের নিকট কোনো মজুরি দাবি কোর না। এই বাণী তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ মাত্র। [ইউসুফ – ১০৪]
খ. বল! আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এবং যারা মিথ্যা দাবি করে আমি তাদের দলভুক্ত নই। [সাদ – ৮৬]
গ. তাদেরকেই (নবীদেরকেই) আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত কোরেছেন। সুতরাং তুমি তাদের পথ অনুসরণ কর; বল! এর জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না। [আনআম – ৯০]
ঘ. বল! আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে প্রেম-ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার ব্যতীত অন্য কোনো মজুরি চাই না। [শুরা – ২৩]
ঙ. আমি তাদেরকে দিয়েছি উপদেশ, কিন্তু তারা উপদেশে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অথবা তুমি কি তাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাও? তোমার প্রতিপালকের প্রতিদানই তো শ্রেষ্ঠ এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রেযেকদাতা। [২৩: সুরা মো’মেনুন: ৭১-৭২]
চ. তবে কি তুমি উহাদের নিকট পারিশ্রমিক চাচ্ছো যা ওরা একটি দুর্বহ বোঝা মনে করে? [৫২: সুরা তুর: ৪০]
সুতরাং কোর’আনের ভাষ্যমতে দীনের, ধর্মের কোনো কাজ কোরে নবী ও রসুলরা যেমন পারিশ্রমিক গ্রহণ কোরতেন না, তেমনি তাঁদের উম্মাহর জন্যও পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়।
ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে রসুলাল্লাহ (দ:) এর একটি বাণী উল্লেখ কোরছি-
আল্লাহর রসুলও তাঁর জাতির মধ্যে যেন ধর্মব্যবসায়ী পুরোহিত শ্রেণি গজিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁর আসহাবদেরকে বার বার সতর্ক কোরে গেছেন। উবায়দা বিন সামেত (রা:) ছিলেন আসহাবে সুফফার অন্তর্ভুক্ত এক সাহাবী। তাঁকে রসুলাল্লাহ কোনো এক গোত্রের লোকদেরকে কোর’আন শিক্ষা দিতে প্রেরণ কোরেছিলেন। সেই গোত্রের একজন ব্যক্তি উবায়দাকে (রা:) আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার উদ্দেশ্যে একটি ধনুক ও তীর উপহার দিয়েছিলেন। উবায়দা (রা:) রসুলাল্লাহর দরবারে ফিরে এসে যখন সেই তীর ও ধনুক তাঁকে দেখালেন তখন রসুলাল্লাহ বোললেন, “যদি তুমি আগুনের তীর গলায় জড়িত হওয়া পছন্দ করো তাহোলে তুমি এটা গ্রহণ করো” (আবু দাউদ)।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সন্দেহ নেই। উবায়দাহ (রা:)-কে কোর’আন শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে যে উপহারটি দেওয়া হোয়েছিল সেটা কোনো অর্থকড়ি নয়, ব্যক্তি ব্যবহার্য কোনো বস্তুও নয়। সেটা হোচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদে ব্যবহারের জন্য একটি অস্ত্র। অথচ সেই অস্ত্রটি গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ হোয়ে গেল, কেবল নিষিদ্ধই না, সেটা আখেরাতে আগুনের তীর হোয়ে গ্রহণকারীর বুকে বিঁধবে এই কারণে যে, তিনি সেটা গ্রহণ কোরেছিলেন কোর’আন শিক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে। এমন ঘটনা আরও আছে। রসুলাল্লাহর এই কথার পর দীনের জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে অর্থ উপার্জনের কোনো পথ খোলা রোইল কি? তা সত্ত্বেও বর্তমানের বিকৃত ইসলামে পয়সা ছাড়া কিছুই হয় না, মুর্দা দাফনেও পয়সা দিতে হয়। মোল্লাদের শিষ্য অর্থাৎ তালবে-এলেম থেকে শুরু করে পীরে কামেল, গাউস কুতুব, মুফতি, শায়খ, নামধারী আল্লামাগণ পয়সা ব্যতীত কেউই ধর্ম-কর্ম করেন না। শুধু তাই নয়, তারা যে মানুষকে ইসলাম থেকে সরিয়ে রাখতে চায় এবং ধর্মকে পুঁজি কোরে সম্পদের মালিক হোতে চায় সেটাও আল্লাহও জানিয়ে দিয়েছেন সুস্পষ্টভাষায়। তিনি বোলেছেন, “হে মো’মেনগণ! আলেম ও সুফিদের (আহবার ও রোহবান) মধ্যে বহুসংখ্যক তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরে চোলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে মানবজাতিকে ফিরিয়ে রাখছে (সুরা তওবা ৩৪)।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ