ঐক্যবদ্ধ হবার এখনই সময়

রাকীব আল হাসান:
শুরুতে একটা গল্প বলি। একবার এক ইঁদুর লক্ষ্য করল যে বাড়িতে ইঁদুর মারার ফাঁদ পাতা রয়েছে। সে খুবই ভয় পেল। ফাঁদটি অকেজো করার জন্য সে ওই বাড়িতে থাকা মুরগির সাহায্য চাইল। সে মুরগিকে বলল- আজ বাড়িওয়ালা আমাকে মারার ফাঁদ পেতেছে কাল তোমাকে জবাই করবে। আমরা তো প্রতিবেশী, আমার সঙ্কট মানে তো তোমারও সঙ্কট। আস আমরা একসাথে সমাস্যার সমাধান করি। মুরগি ঘটনা শুনে জবাব দিল- “ফাঁদটি আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। অতএব আমি এখানে কোন সাহায্য করতে পারব না”।
মুরগির কাছ থেকে এই উত্তর শুনে ইঁদুর খুব দুঃখিত হলো এবং ছাগলের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইল। ছাগলকেও সে সব বুঝিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর মোকাবেলা করার অনুরোধ জানালো। ছাগল বললো- “ওই ফাঁদ বড়দের জন্য নয়। আমি এখানে তোমাকে কোন সাহায্য করতে পারব না”।
ইঁদুর ছাগলের কাছ থেকে একই উত্তর শুনে দুঃখিত হয়ে গরুর কাছে এলো। গরুকেও সে ঐক্যবদ্ধ হবার প্রাসঙ্গিকতা বোঝানোর চেষ্টা করল কিন্তু এবারও সে বিফল হলো। সব শুনে গরু বললো- “ইদুরের ফাঁদ আমার মতো বড় প্রাণীর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। যা আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না তা নিয়ে আমি কেন বৃথা চিন্তা করব?”। ইঁদুর শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে তার ঘরে ফিরে এলো।
রাতের বেলা বাড়ির কর্ত্রী অন্ধকারের ভিতর বুঝতে পারলেন যে ফাঁদে কিছু একটা ধরা পড়েছে। অন্ধকারে ফাঁদের কাছে হাত দিতেই উনি হাতে কামড় খেলেন এবং দেখলেন ফাঁদে ইঁদুরের বদলে সাপ ধরা পড়েছে। তার চিৎকারে কর্তার ঘুম ভাঙল। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকা হলো। চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু অবস্থা মোটেই ভালো না। পথ্য হিসেবে ডাক্তার মুরগির সুপ খাওয়াতে বললেন। স্যুপের জন্য কর্তা মুরগিকে জবাই করে দিলেন। অবস্থা আস্তে আস্তে আরও খারাপ হতে লাগলো। দূর দূরান্ত থেকে আরও অনেক আত্মীয় স্বজন আসতে লাগলো। বাধ্য হয়ে কর্তা ছাগলকে জবাই করলেন তাদের আপ্যায়ন করার জন্য। আরও ভালো চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার হতে লাগলো। অবশেষে বাড়ির কর্তা তাদের গরুটিকে কসাইখানায় বিক্রি করে দিল। একসময় বাড়ির কর্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠল। আর এই সমস্ত কিছু ইঁদুরটি তার ছোট্ট ঘর থেকে পর্যবেক্ষণ করল।
শিক্ষা: কেবল নিজের চিন্তায় যে মগ্ন, নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না তার বিপদকালেও কেউ এগিয়ে আসবে না। প্রতিবেশির বিপদ মানেই নিজের বিপদ, দেশ ও জাতির সঙ্কট মানেই নিজের সঙ্কট, মুসলিম হিসাবে মুসলমান জাতির উপর বিপদ মানে সেটা আমার উপরেও বিপদ- এই চিন্তা থেকে যে নিজেকে মুক্ত করে কেবল স্বার্থচিন্তায়, আত্মচিন্তায় নিমগ্ন তার বিপদ অনিবার্য। ইহজগৎ ও পরজগৎ উভয় জায়গাতেই সে বিপদগ্রস্ত হবে। তার হাজার এবাদতও তাকে জাহান্নাম থেকে, নরক থেকে, হেল থেকে মুক্ত করতে পারবে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে এই গল্পের সামঞ্জস্য: আজ রোহিঙ্গাদের সঙ্কট দেখে যারা ভাবছেন এটা আমাদের সঙ্কট নয়, এখানে আমাদের করণীয় কিছুই নেই তাদের অবস্থা এই গল্পের মতোই হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
প্রথম কথা হলো- রোহিঙ্গাদের উপর এই নির্যাতন হচ্ছে কেন? তারা যদি মুসলিম না হয়ে হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইহুদি বা বৌদ্ধ হতো তবে কি এই নির্যাতন হতো? না, কখনোই হতো না। পৃথিবীর কোথাও কি অন্য কোনো জাতি বর্তমানে এভাবে লাঞ্ছিত, অপমানিত, নিপীড়িত হচ্ছে? কেবল মুসলিমরাই সর্বক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন জায়গাতে নির্যাতিত হচ্ছে। কেবল দুর্বল দেখে দেখে পাকড়াও করা হচ্ছে। আজ এক মুসলিম সম্প্রদায়কে তো কাল অন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে ধরা হবে। তাহলে মুসলিম দেশ হিসাবে আমাদের কি কোনো ভাবনা-চিন্তার কারণ নেই?
দ্বিতীয় কথা হলো- এমন মানবতাবিরোধী চরম নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো সত্তে¡ও পরাশক্তি, আঞ্চলিক পরাশক্তিধর দেশগুলো মিয়ানমারের পক্ষ নিল কেন? কারণ নির্যাতন হচ্ছে মুসলিমদের উপর। তার অর্থ হলো- বাংলাদেশের উপর যদি এমন সঙ্কট নেমে আসে, কোনো দেশ যদি বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে এভাবে নিধনযজ্ঞ চালায় তবে কি কোনো দেশ আমাদের পক্ষ নেবে? নেবে না। রোহিঙ্গাদের মতোই অবস্থা হবে আমাদের। তারা তো সীমান্ত পার হয়ে অন্তত আশ্রয় নেবার জায়গা পেয়েছে আমাদের সেটাও থাকবে না। কেউ বলতে পারেন, ভারত তো ’৭১ এ আমাদের পক্ষ নিয়েছিল তবে আজ কেন নেবে না? তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- ’৭১ এ ভারত আসলে তাদের চিরশত্রু পাকিস্তানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, এটা ছিল তাদের স্বার্থ। মুসলিম দেশ হিসাবে পাকিস্তান ভারতের চিরশত্রু। এখন আমরা যদি আক্রান্ত হই তবে কোনো মুসলিম দেশ দ্বারা হব না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান অথবা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থেকে সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে কেউ এগিয়ে আসবে না, যে যার মতো করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চাইবে। সঙ্কট তৈরি হতে পারে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে, অভ্যন্তরীণভাবে জঙ্গিবাদের উত্থান থেকে অথবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে।
এখন আমাদের করণীয়: এখন আমরা কী করতে পারি? প্রথমত সরকারের কাছে আমরা দাবি জানাতে পারি রোহিঙ্গাদের যেন সম্মানের সাথে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন দেশ ও বৈদেশিক সংস্থা থেকে যে ত্রাণ-সাহায্য আসছে তা যেন সুষ্ঠুভাবে বণ্টিত হয় তার দাবি জানাতে পারি। এটা সাময়িক সমাধান, তবে রোহিঙ্গা-সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের নিকট, সরকারের বিভিন্ন আমলাদের নিকট আমরা দাবি জানাতে পারি সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে যেন রোহিঙ্গাদের নিজ জন্মভ‚মিতে ফেরত পাঠানো যায় এবং তাদের অধিকার সেখানে নিশ্চিত করা যায়। ইতোমধ্যে সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে আমরা আশা করি সরকার সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
কিন্তু আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি তারা কি কেবল এই দাবি জানিয়েই বসে থাকব? আমাদের কি আর কোনো করণীয় নেই? আমাদের চিন্তা করতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানই যথেষ্ট নয় বরং আমাদের দেশও যেন এমন সমস্যায় আক্রান্ত না হয় সেই প্রচেষ্টা করা। এজন্য আমাদের এখন প্রধান কর্তব্য হলো দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা। ’৭১ এ আমরা যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম দেশকে রক্ষা করার জন্য তেমনিভাবে আবার আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রসুলাল্লাহ (সা.) যেমন মদীনার মাটিকে রক্ষা করার জন্য সেখানকার মানুষগুলোকে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তেমনিভাবে আজ আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যই পারে একটা জাতিকে যাবতীয় সঙ্কট থেকে রক্ষা করতে। ঐক্যবদ্ধ হলে যেমন আমরা সামরিকভাবে শক্তিশালী হব তেমনি সমস্ত দিক দিয়ে আমরা সমৃদ্ধ হব। একটা জাতি, একটা দেশ এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শর্তই হলো ঐক্য। জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে তাদের নেতা জাতির কল্যাণে যে সিদ্ধান্ত নেয় সকলে মিলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ফেলে। আরবের পশ্চাতপদ, আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, অশিক্ষিত, অবজ্ঞাত, পরস্পর দ্ব›দ্ব-কলহে লিপ্ত জাতিকে রসুলাল্লাহ (সা.) সর্বশ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছিলেন কী দিয়ে? তওহীদ তথা যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে মানুষদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। যখন ঐক্যবদ্ধ করলেন তখন যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।
ঐক্যের ভিত্তি:
প্রশ্ন হতে পারে আমরা কিসের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হব? রসুলাল্লাহ (সা.) যে কলেমার ভিত্তিতে আরবের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সেই কলেমা তথা যাবতীয় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। যে অন্যায় করবে আমরা সবাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো, সে আমার ভাই-বোন, পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র হলেও আমরা তার অন্যায়ের সমর্থন করব না। অন্যায়কারী কোন দলের, কোন ধর্মের, কোন লেবাস পরে আছে তা দেখব না। আমরা যদি এই ন্যায়ের দণ্ড ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করতে পারি তবে আমরাই হব পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার। ঐক্যবদ্ধ ১৬ কোটি মানুষের সামনে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই যে চোখ তুলে তাকাবে।
আমার এই কথায় কেউ বলতে পারেন- আপনি শুধু শুধুই মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছেন কেন? আমাদের দেশের উপর কোনো সঙ্কট নেই। তাদের উদ্দেশে আমার কথা হলো- যদি আমাদের দেশ আক্রান্ত না হয় তবে তো আমরা বেঁচেই গেলাম কিন্তু যদি সত্যিই এমন কিছু হয়ে যায় তখন কী করবেন? ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানী মানুষের কাজ। ঝড়ের আগেই যদি ঘরে খুঁটি না লাগান তবে ঝড় এসে গেলে আর রক্ষা নেই। সঙ্কট আসুক অথবা নাই আসুক ঐক্যবদ্ধ হলে তো ক্ষতি নেই বরং সমস্ত দিক থেকেই লাভ। তাছাড়া ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা হব একটা বিরাট শক্তি, তখন মিয়ানমারের মতো দেশ এমন স্পর্ধাই দেখাতে পারবে না আজ যা করছে। সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য, সমগ্র মানবজাতির জন্য, পৃথিবীর সকল নির্যাতিত মানুষের জন্য আমরা ভরসা হতে পারব। কাজেই এখনই সময় ঐক্যবদ্ধ হবার।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ