এক নজরে মানবজীবন ও উম্মতে মোহাম্মদী

মোখলেছুর রহমান সুমন:

  • আল্লাহ মালায়েকদের ডেকে বললেন, আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা (প্রতিনিধি) প্রেরণ করতে চাই। মালায়েকগণ বললেন, ‘আমরা কি আপনার গুণগান করার জন্য যথেষ্ট নই? আপনার এই খলিফা তো পৃথিবীতে অন্যায়-অশান্তি-রক্তপাত করবে।”আল্লাহ বললেন, “আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।” (সুরা বাকারা ৩০)
  • আল্লাহ নিজ হাতে আদমকে তৈরি করে (সুরা সাদ ৭৫) তার ভেতরে নিজের রূহ ফুঁকে দিলেন (সুরা হিজর ২৯)। ফলে আদম আল্লাহর সমস্ত গুণাবলীর পাশাপাশি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হয়ে গেল।
  • আল্লাহ সমস্ত মালায়েকদের আদমকে সেজদা করার (অর্থাৎ আদমের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার) হুকুম দিলেন। ইবলিস ব্যতিত সবাই আদমকে সেজদাহ করল। ইবলিস আল্লাহর হুকুম অমান্য করে কাফের, জালেম, ফাসেক, রাজিম, মালাউন হলো (সুরা আরাফ ১১)।
  • সে চ্যালেঞ্জ করল যে বনি আদমকে সে আল্লাহর পাঠানো সেরাতুল মোস্তাকিম (তওহীদ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, সহজ সরল পথ) থেকে বিচ্যুত করে দেবে (সুরা আরাফ ১৬)। যদি সে সরাতে পারে তাহলে বনি আদম অন্যায়, অশান্তি ও রক্তপাতের মধ্যে নিমজ্জিত হবে এবং প্রমাণিত হবে যে সেই ঠিক ছিল।
  • এই চ্যালেঞ্জে ইবলিসের বিরুদ্ধে আল্লাহকে বিজয়ী করার জন্য আদমের একটাই কাজ, আল্লাহর খেলাফত করা। এটাই তার এবাদত। সে যদি এই পৃথিবীতে (ফিল আরদ্) আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব না করে তাহলে তার ব্যক্তিগত ঈমান ও আমলের কোনো মূল্য নেই।
  • প্রশ্ন হলো, সে খেলাফত করবে কীভাবে? সেটা হলো, জীবনের সর্বাঙ্গনে সে “আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানবো না”- এই অঙ্গীকার করবে অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সে মানবজীবন থেকে সমস্ত অন্যায়, অশান্তি, যুদ্ধ, রক্তপাত দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।
  • এই কাজ যারা করবে তারাই মো’মেন, আল্লাহর খলিফা। তারা আবার তাদের মূল বাসস্থান জান্নাতে ফিরে যেতে পারবে।
  • এজন্য আল্লাহ যত নবী-রসুল প্রেরণ করেছেন সবার দীনের মূল ভিত্তি ছিল তওহীদ- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (সুরা আম্বিয়া ২৫)। এটা হচ্ছে আল্লাহর সাথে বান্দার একটি চুক্তি (contract) । যারা এই চুক্তিতে আবদ্ধ হলো, যাবতীয় আমল তাদের জন্যই প্রযোজ্য।
  • অন্যান্য নবীরা এসেছেন যার যার গোত্র, অঞ্চল, এমনকি পরিবারের জন্য। কিন্তু শেষ নবী (সা.) এসেছেন সমগ্র মানবজাতির জীবনে এই তওহীদ ভিত্তিক দীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য (সুরা তওবা ৩৩)। এটা প্রতিষ্ঠা হলে মানুষ ইবলিসের দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে এবং পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটাই হলো আল্লাহর বিজয়।
  • এই লক্ষ্যে তিনি একটি জাতি, উম্মাহ গঠন করলেন যা উম্মতে মোহাম্মদী বলে পরিচিত হলো। সেই জাতিকে ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য শিক্ষা দিলেন, জেহাদ করার অনুপ্রেরণা দিলেন। ফলে সেই জাতি রসুলাল্লাহর সঙ্গে থেকে তাঁর জীবদ্দশায়ই সমগ্র আরব উপদ্বীপে সত্য দীন প্রতিষ্ঠা করলো।
  • রসুলের ইন্তেকালের পর তাঁর হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদী ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্বল, পুত্র-পরিজন সর্বস্ব কোরবান দিয়ে প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে অর্ধপৃথিবীতে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা করল। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, অর্থনীতিতে, সামরিক শক্তিতে, সভ্যতায়, নতুন নতুন আবিষ্কারে, এক কথায় সর্বদিক দিয়ে তারা শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হলো। শত্রু ভাই হলো, ঐক্যহীনেরা ঐক্যবদ্ধ হলো, স্বার্থপররা মানবতার কল্যাণকামী হলো, দারিদ্র্য দূর হয়ে সমৃদ্ধি আসলো, ভীরু জাতি দুঃসাহসী হলো, মর্যাদাহীন স্বীকৃতিহীন নারীরা সামাজিক, সামরিক, সরকারি সকল কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ পেল। সেই জাতির মধ্যে বর্তমানের মতো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্বলিত তাফসির, ফেরকা, মাজহাবের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। তাদের প্রভু যেমন একজন ছিলেন, তাদের দীনও ছিল একটি, নেতাও ছিলেন একজন, জীবনের লক্ষ্যও ছিল একটি – মানবতার কল্যাণ। এজন্যই তারা মর্যাদাবান, শক্তিশালী, শ্রেষ্ঠ, সভ্য জাতি হতে পেরেছিলেন। বাকি দুনিয়ার মানুষ সভয়-সম্ভ্রমে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো।
  • কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো, রসুলের সাহাবীরা চলে যাওয়ার পর পরবর্তী প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব ভুলে গেল। শাসকশ্রেণি অন্যান্য রাজা-বাদশাহদের মতো ভোগবিলাসে মত্ত হলো। আলেম-পণ্ডিতশ্রেণির বিশ্লেষণ-অতি বিশ্লেষণের ফলে এক উম্মাহ হাজারো ফেরকা মাজহাবে বিভক্ত হয়ে গেল। অন্যদিকে পারস্য থেকে বিকৃত সুফিবাদ প্রবেশ করে জাতির সংগ্রামী চরিত্রকে অন্তর্মুখী-ঘরমুখী করে দিল। সেই বিকৃত সুফিবাদের ফলে জাতি হাজারো তরিকায় বিভক্ত হয়ে গেল। ফলে একদা লৌহকঠিন ঐক্যবদ্ধ দুর্বার দুর্বিনীত, শত্রুর মনে ত্রাস সঞ্চারকারী মহাজাতি ফেরকা-মাজহাব-তরিকায় খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে দুর্বল, নিষ্প্রাণ হয়ে গেল এবং নিজেরা নিজেরা তর্ক, বাহাস, মারামারি করতে লাগলো।
  • এই ভয়ংকর পথভ্রষ্টতার শাস্তি হিসাবে আল্লাহ লানত হিসেবে তাদেরকে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান জাতিগুলোর গোলাম বানিয়ে দিলেন (সুরা আনফাল ১৬)। সেই ইউরোপীয় খ্রিষ্টান প্রভুরা কয়েকশ’ বছর শাসন ও শোষণ করার পর তাদেরকে শিক্ষাহীন, দীক্ষাহীন, প্রগতিহীন এক জাতিতে পরিণত করলো, এক কথায় দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করলো।
  • আজও তারা সেই দাসত্ব থেকে মুক্ত হয় নি। এখনও তারা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করছে না, প্রতিনিধিত্ব করছে ইবলিসের, পূজা করছে শয়তানী শক্তির। আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে তারা পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার অনুকরণ করছে। ফলে তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হচ্ছে। আজ তারা সমস্ত পৃথিবীতে লাঞ্ছিত, অপমানিত, অপরাপর সমস্ত জাতির দ্বারা নিগৃহীত। সাম্রাজ্যবাদীরা একে একে তাদের দেশগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে।
  • এই অবস্থায় একটাই করণীয়, আল্লাহর খলিফা হিসেবে আবার সেই তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তওবা করে পুনরায় আল্লাহর দেয়া হুকুম মান্য করার অঙ্গীকারে ফিরে আসা। তাহলে তারা পৃথিবীতেও শান্তিতে থাকবে, পরকালেও জান্নাতী হবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ