উম্মতে মোহাম্মদীর সংগ্রাম কিসের লক্ষ্যে?

মোহাম্মদ আসাদ আলী:

উদ্দেশ্য যদি ভুল হয় তাহলে কোনো কিছুরই আর দাম থাকে না। ধরুন, ১০ জন লোক একটা উদ্দেশ্য নিয়ে রওয়ানা হলো, অর্ধেক পথ গিয়ে যদি ১০ জনের উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দেওয়া যায় তাহলে কী হবে, একেকজন একেক কাজ করতে থাকবে, শেষ গন্তব্যস্থলে কেউই যেতে পারবে না। কাজেই ইসলামে এই জন্য সকল পণ্ডিতগণ একমত যে আকিদা ভুল হলে ঈমানের কোনো দাম নেই। এই আকিদাই হলো (Comprehensive concept) সামগ্রিক ধারণা। পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন বা আকিদাহীন কোনো কিছুই নেই। যা কিছু আকিদাহীন তাই অর্থহীন। সুতরাং কোনো জাতি, গোষ্ঠি, দল বা আন্দোলনও উদ্দেশ্যহীন হতে পারে না।
আজ যদি কোনো কমিউনিস্টকে প্রশ্ন করা যায় যে, তোমরা পৃথিবীময় সংগ্রাম করছ, বহু কোরবানি করেছ, কমিউনিজমকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছ, এসব কেন করছ? ঐ কমিউনিস্ট অবশ্যই জবাব দেবেন যে, পৃথিবীতে যে সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে সেটার পরিণাম হচ্ছে অর্থনৈতিক অবিচার, শোষণ, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। কাজেই সেটাকে ভেঙ্গে সেখানে কমিউনিজম চালু করলে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন হবে, মানুষ খেয়ে পরে বাঁচবে এবং মানুষের ঐ কল্যাণের জন্য পৃথিবীময় কমিউনিস্টরা নিজেদের সব কিছু উৎসর্গ করে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন- অর্থাৎ মানুষের কল্যাণের জন্য তারা নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
ঠিক ঐ কারণেই অর্থাৎ মানব জাতির বৃহত্তর কল্যাণের জন্য বিশ্বনবীর (সা.) সৃষ্ট জাতি পার্থিব সব কিছু ত্যাগ করে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শুধু তফাৎ এই যে, কমিউনিস্টরা যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সংগ্রাম করছে তা মানুষের তৈরি যা শান্তি, ইসলাম আনতে পারবে না, আরও অশান্তি সৃষ্টি হবে। তার বাস্তব প্রমাণ আমরা ইতোমধ্যেই দেখেছি। কমিউনিজমের পতন হয়ে গেছে প্রায় দুই যুগ হতে চলল।
আর বিশ্বনবীর (সা.) জাতি, উম্মাহ যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সংগ্রাম করেছিলেন সে ব্যবস্থা হলো স্বয়ং স্রষ্টার তৈরি ব্যবস্থা, দ্বিতীয় তফাৎ হলো মানুষের তৈরি বলে কমিউনিজম মানুষের শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির একটা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। মানুষের জীবনের অন্যান্য দিক সম্বন্ধে ওটার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু মানুষ শুধু দেহ নয় আত্মাও, শুধু জড় নয় আধ্যাত্মিকও। পক্ষান্তরে আল্লাহ যে জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন তা মানুষের দেহের ও আত্মার প্রয়োজনের নিখুঁত সংমিশ্রণ। আল্লাহ বলেন, ‘এমনইভাবে আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী বা ভারসাম্যযুক্ত জাতি হিসাবে সৃষ্টি করেছি যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য আর যাতে রসুল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য (সুরা বাকারা ১৪৩)। এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন ওয়াসাতা যার অর্থ ভারসাম্যযুক্ত (Balanced), মধ্যপন্থী। এই ভারসাম্যযুক্ত জীবন ব্যবস্থাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে মানব জাতির মধ্যে শান্তি, ইসলাম আনয়ন করাই হচ্ছে একমাত্র উদ্দেশ্য, যে জন্য আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবীকে (সা.) পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যে কাজ এক জীবনে সমাপ্ত করা অসম্ভব, সে কাজের ভিত্তি তিনি স্থাপন করলেন সংগ্রামের মাধ্যমে সমগ্র আরব উপদ্বীপকে এই শেষ জীবন বিধানের অধীনে এনে। এই সময়ের মধ্যে অর্থাৎ তাঁর জীবিত কালের সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি তাঁর সৃষ্ট জাতিকে হাতে কলমে শিখিয়ে গেলেন ইসলামের উদ্দেশ্য (সমস্ত পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে মানবজাতির মধ্যে শান্তি, ইসলাম, স্থাপন করা) ও প্রক্রিয়া (সালাত, সওম, হজ্ব , যাকাত ইত্যাদি)। এবং তার সৃষ্ট জাতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়ে গেলেন যে তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব তাঁর (সা.) পরে তাদের উপর সম্পূর্ণভাবে অর্পিত হবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে না তারা আর তার জাতিভুক্ত থাকবে না।
আজকে সারা পৃথিবীতে ১৬০ কোটি মানুষ আছে যারা নিজেদেরকে উম্মতে মোহাম্মদী বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন কিন্তু তারা জানেন না উম্মতে মোহাম্মদী হিসাবে কী তাদের দায়িত্ব। তাদের বিশ্বাস নামাজ রোজা করাই তাদের একমাত্র কাজ। আরও ভালো উম্মতে মোহাম্মদী হতে নামাজ রোজা ইত্যাদি উপাসনাগুলিই আরও বেশি বেশি করতে হবে। তারা ভুলেই গেছেন তাদের সৃষ্টিই হয়েছে আল্লাহর দেওয়া সত্য জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করার উদ্দেশ্যে। তা না করে এই জাতি ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’ অর্থাৎ দাজ্জালের দেওয়া বিভিন্ন মতবাদ, জীবনব্যবস্থা যেমন গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, এক নায়কতন্ত্র ইত্যাদি মেনে নিয়ে আর নামাজ রোজা করে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। তারা জানেনও না যে তারা আর রসুলের জাতিভুক্ত নেই, মুমিন মুসলিমও নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা কেবল কাফের মোশরেক এবং অভিশপ্ত অর্থাৎ মালাউন।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ