ইবলিশের মূল লক্ষ্য মানুষকে তওহীদ থেকে সরানো

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলি ও বিজ্ঞান একমত যে মানুষ সৃষ্টির বহু আগে স্রষ্টা এই বিপুল বিশ্ব-জগত সৃষ্টি করেছেন। এই বিশাল সৃষ্টিকে তিনি প্রশাসন ও পরিচালনা করতেন এবং করেন তাঁর অসংখ্য মালায়েকদের দিয়ে যাদের আমরা বলি ফেরেশতা- ফারসি ভাষায়, ইংরেজিতে Angel।
এই সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার পর আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইচ্ছা হল এমন একটি সৃষ্টি করার যার মধ্যে আল্লাহর রূহ থাকবে। তারা হবে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। তাঁর এই ইচ্ছা কেন হলো তা আমাদের জানা নেই। কারও জানা আছে কিনা তাও জানা নেই। ঐ সময়টার কথা বলতে যেয়ে তিনি কোর’আনে আমাদের যা বলেছেন তা এই যে, যখন আল্লাহ তার মালায়েক অর্থাৎ ফেরেশতাদের বললেন যে আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেছি তখন তারা বললেন- কী দরকার তোমার প্রতিভু সৃষ্টি করার? ওরাতো পৃথিবীতে ফ্যাসাদ, অশান্তি আর রক্তপাত করবে। অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। আল্লাহ বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। (বাকারা ৩০)
এরপর আল্লাহ আদমকে তৈরি করলেন তাঁর নিজ হাতে। নিজের রূহ থেকে আদমের মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন। মালায়েকদের হুকুম করলেন আদমকে সেজদাহ করতে। আদমকে সেজদাহ করার মাধ্যমে মালায়েকরা আদমের সেবায় নিয়োজিত হলেন। একমাত্র ইবলিশ সেজদাহ করল না। সে অহংকার করে আল্লাহর হুকুম অমান্য করল। কিন্তু ইবলিশের এই ধৃষ্টতা আল্লাহ বরদাস্ত করলেন না। কারণ তিনি সমস্ত সৃষ্টিজগতের ইলাহ, একমাত্র হুকুমদাতা। তাঁর হুকুমের অবাধ্য হলে হাজার বছরের এবাদত, উপাসনাও নিষ্ফল হয়ে যায়। ইবলিশেরও তাই হলো। সে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়ে গেল।
তারপরের ঘটনা সংক্ষেপে এই যে, ইবলিশ আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিল, তোমার যে সৃষ্টির কারণে আমাকে বিতাড়িত ও অভিশপ্ত করলে আমাকে যদি সেই সৃষ্টির দেহ-মনের মধ্যে ঢুকে প্ররোচনা দেবার শক্তি দাও তাহলে আমি প্রমাণ করে দিব, ঐ সৃষ্টি তোমাকে হুকুমদাতা হিসেবে মানবে না। আল্লাহ ইবলিশের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাকে আদমের দেহ, মন, মস্তিষ্কে প্রবেশ করার শক্তি দিলেন। এরপর আল্লাহ আদমের জন্য তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন, তাদের জান্নাতে বাস করতে দিলেন একটি মাত্র নিষেধ আরওপ করে। কিন্তু আল্লাহর অনুমতি পেয়ে ইবলিস আদম ও হাওয়ার মধ্যে প্রবেশ করে তাদের প্ররোচনা দিয়ে ঐ একটিমাত্র নিষেধকেই অমান্য করালো, যার ফলে আল্লাহ তাদের জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নির্বাসন দিলেন এবং বললেন, ‘যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে তার কোনো ভয় নেই (বাকারা ৩৮)। কীসের ভয় নেই? ঐ যে মানুষ সৃষ্টির সময় মালায়েকরা অন্যায়, অশান্তি, রক্তপাতের ভয় করেছিলেন সেই অন্যায়, অশান্তি ও রক্তপাতে পড়ে যাবার ভয় নেই।
এখানে একটি বিষয় পাঠকদের বুঝে নেওয়া দরকার যে, মানুষ সৃষ্টির বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে মালায়েকরা অর্থাৎ ফেরেশতারা কিন্তু বলেন নাই যে, মানুষ নামাজ পড়বে না, রোজা রাখবে না, উপাসনালয়ে যাবে না ইত্যাদি। এসবের কিছুই তারা বলেন নি, বলেছেন নির্দিষ্ট করে ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা অর্থাৎ অন্যায়, অবিচার, রক্তপাতের কথা। তার মানে মানুষের মূল সমস্যাটা নামাজ-রোজায় নয়, এবাদত-উপাসনায় নয়, মূল সমস্যা হচ্ছে তার শান্তিতে বসবাস করায়। এবং খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানবজীবনের মূল সমস্যাই হচ্ছে, অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত। একই অবস্থা বর্তমানেও। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাস রাখছে। কেউ মসজিদে যাচ্ছে, কেউ মন্দিরে যাচ্ছে, কেউ গীর্জায় যাচ্ছে, কেউ প্যাগোডায় যাচ্ছে। সবাই চেষ্টা করছে যার যার ধর্মের উপাসনা, আনুষ্ঠানিকতা ইত্যাদি নিখুঁতভাবে পালন করতে। কিন্তু জাতিগতভাবে সমস্ত মানুষ আল্লাহর হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করে বসে আছে। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক জীবন পরিচালিত হচ্ছে মানুষের সার্বভৌমত্বভিত্তিক দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা দিয়ে। ইবলিশ মানুষের কাছে ঠিক এটাই চায়। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ যত ইচ্ছা ধর্মকর্ম করুক, ইবলিশের তাতে আপত্তি নেই, তার কেবল এটুকু হলেই চলে যে, মানুষ জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করবে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট কারণ এটুকু করলেই মানুষ অনিবার্য অশান্তিতে পতিত হবে, ইবলিশ বিজয়ী হবে। অন্যদিকে আল্লাহর অভিপ্রায় হচ্ছে মানুষ যাতে তাদের সমষ্টিগত জীবনে অন্য সবার সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
আমরা যদি সামগ্রিক ব্যাপারটিকে এক নজরে দেখার চেষ্টা করি তাহলে আদম সৃষ্টি থেকে নিয়ে আদম-হাওয়ার পৃথিবীতে আগমন পর্যন্ত সময়কে একটি ভাগে ফেলতে পারি। দ্বিতীয় ভাগটি হচ্ছে পৃথিবীর জীবন, অর্থাৎ যেটা বর্তমানে চলছে, যার সমাপ্তি ঘটবে কেয়ামতের মাধ্যমে। এটা পরীক্ষাপর্ব। আর তৃতীয় ভাগটি হচ্ছে আখেরাত। চূড়ান্ত পরিণতির কাল।
আল্লাহ যে একটিমাত্র সৃষ্টিকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নিজ হাতে তৈরি করলেন, যুক্তির শক্তি, বুদ্ধির শক্তি, উপলব্ধির শক্তি দিলেন সেই সৃষ্টি স্বাধীন ইচ্ছা পেয়ে কী করল- এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তার হাশর হবে। যেহেতু পরীক্ষার জন্য বিপক্ষশক্তি প্রয়োজন, কাজেই আল্লাহ ইবলিশ বা শয়তানকে সেই বিপক্ষশক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এখন মানুষের সামনে দুইটি দিক- ডান ও বাম। একদিকে আল্লাহর হুকুম, অন্যদিকে ইবলিশের প্ররোচনা। একদিকে আল্লাহর দেখানো পথ হেদায়াহ অর্থাৎ তওহীদ, অন্যদিকে ইবলিশের প্ররোচনায় আল্লাহর হুকুমের বিপরীত মানুষের মনগড়া মত, পথ, তন্ত্র, মন্ত্র ইত্যাদি অর্থাৎ দালালাত। যেহেতু পথ দুইটি, কাজেই পৃথিবীতে অবস্থাও মোটের উপর দুইটি- শান্তি ও অশান্তি। হাশরে পরিণতিও দুইটি- জান্নাত ও জাহান্নাম। আল্লাহ ও ইবলিশের এই চ্যালেঞ্জে মাঝখানটায় আছে মানুষ, মানুষের ইচ্ছাশক্তি তার পরীক্ষা। সে কোনদিকে যাবে এই সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে। সে আল্লাহকে জয়ী করবে নাকি ইবলিশকে? আল্লাহকে জয়ী করতে চাইলে আল্লাহর তওহীদের স্বীকৃতি দিতে হবে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ বা হুকুমদাতা হিসেবে গ্রহণ করা চলবে না। যদি তওহীদ অস্বীকার করে অন্য কাউকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা হয় অথবা অন্ততপক্ষে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা হয় তাহলেই ইবলিশ বিজয়ী হয়ে যাবে। সেই প্রথম মানুষ আদম (আ.) এর সময় থেকেই ইবলিশ তার সমস্তশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে মানুষকে আল্লাহর দেখানো পথ (সেরাতুল মোস্তাকীম) অর্থাৎ তওহীদ থেকে সরিয়ে দালালাতে নিক্ষেপ করতে। ইবলিশের সমস্ত প্ররোচনার লক্ষ্যবস্তু এটাই। উপাসনা, আরাধনা, আনুষ্ঠানিকতা করতে বাধা দেওয়া ইবলিশের লক্ষ্য নয়, কেননা এগুলোতে তার চ্যালেঞ্জে জয়-পরাজয় নির্ভর করে না, যে কথা পূর্বেই বলে এসেছি। তার বিজয় কেবলমাত্র আল্লাহর তওহীদকে অস্বীকার করাতে পারলে। মানুষ যখনই ইবলিশের ধোঁকায় পা দিয়ে ঐ কাজটি করেছে তখনই তাদের জীবনে নেমে এসেছে অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত এক কথায় অশান্তি। আর যখন মানুষ ইবলিশের প্ররোচনাকে উপেক্ষা করে তওহীদের স্বীকৃতি প্রদান করেছে তখন তাদের জীবন শান্তি, সমৃদ্ধিতে ভরে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির ইতিহাস এই সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, তওহীদণ্ডশেরক, হেদায়াহ-দালালাতের দ্বন্দ্বের ইতিহাস। আরও গোড়ায় গেলে আল্লাহ ও ইবলিশের সার্বভৌমত্বের দ্বন্দ্বের ইতিহাস।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ