আমরাই হতে পারি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি (পর্ব ০২)

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
(পূর্ব প্রকাশের পর) দীর্ঘ তেরশ’ বছর প্রকৃত ইসলাম ও কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত থাকার পর আল্লাহ অশেষ দয়া করে আবার ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর রসুলের রেখে যাওয়া সেই পাঁচ দফা কর্মসূচি তাঁরই এক প্রিয় বান্দা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মাধ্যমে আবার আমাদেরকে দান করেছেন। সত্য ইসলামের ভিত্তিতে তিনি মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচ দফার সেই কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করার জন্য আহ্বান করেছেন।
ঐক্য:
আমাদের জন্য এখন প্রথম কাজই হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। আল্লাহর রসুল যে জাতির মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল সার্বক্ষণিক কলহ, বিবাদ অর্থাৎ চূড়ান্ত অনৈক্য। তারা ছিল বংশধারার ভিত্তিতে শত শত গোত্রে বিভক্ত। তুচ্ছ কারণে, যেমন একটি ঘোড়ার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে শত শত মানুষ যুগের পর যুগ ধরে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। এই কলহপ্রিয় আরবদেরকে আল্লাহর রসুল এমন একটি জাতিতে রূপান্তরিত করলেন যাদেরকে আল্লাহ গলিত সীসার তৈরি প্রাচীরের সঙ্গে তুলনা করেছেন (সুরা সফ-৪)। জাতির ঐক্য হচ্ছে সবার উপরে। যারা ঐক্য নষ্ট করে তারা হচ্ছে জাতির শত্রু। আল্লাহর ভাষায় ঐক্য নষ্টকারীরা কাফের এবং মোনাফেক। ঐক্য ধ্বংসের প্রথম কারণ হচ্ছে নেতা কোনো সিদ্ধান্ত দিলে সে বিষয়ে মতভেদ করা। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে একজনের দোষ-ত্রুটি নিয়ে তার আড়ালে সমালোচনা করা। যারা জাতির মঙ্গল চায় তারা কখনোই এই জাতিধ্বংসকারী কাজগুলো করবে না।
আজকে আমাদের এই বাঙালি জাতির অবস্থা কি? এই ১৬ কোটির জাতিটির জাতীয় ঐক্য এমনভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে যে এর মধ্যে একটি পরিবারও খুঁজে পাওয়া মুশকিল যাদের মধ্যে ঐক্য আছে। পুরো জাতিটি আজ রাজনীতিক দলাদলি করে, ধর্মীয় বিষয়ে মতবিরোধ করে হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। প্রতিটি রাজনীতিক দলের মধ্যেও আছে বহু বিভক্তি, তারা নিজেরা নিজেদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সংঘাত করে প্রায়ই হতাহত হয়। আমাদের জাতীয় ও রাজনীতিক পরিম-লে এই হিংসাত্মক হানাহানির পরিবেশ আমরাই তৈরি করে রেখেছি যার ফলে আমরা নিজেরাই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছি। এ বিষয়ে আল্লাহর শিক্ষা হচ্ছে, নিশ্চয়ই সকল মো’মেন ভাই ভাই। আল্লাহর রসুল বললেন, “সমস্ত মো’মেন একটি অভিন্ন দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গে আঘাত লাগলে সারা দেহেই তা অনুভূত হয়।” জীবনের বিনিময়ে হলেও জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করার যে শিক্ষা আল্লাহ দিয়েছেন সে শিক্ষায় আমাদেরকে নতুন করে শিক্ষিত হতে হবে। যদি এই জাতিটিকে ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয় তাহলে ১৬ কোটির এই জাতি আর অবজ্ঞাত অবহেলিত হয়ে থাকবে না, কারণ ঐক্যই শক্তি। তখন পৃথিবীর বুকে আমরাই হব একটি পরাশক্তি। শুধু তা-ই নয়, সমগ্র বিশ্ব সম্মানে, শ্রদ্ধায় আমাদের পায়ে লুটিয়ে পড়বে।
শৃঙ্খলা:
একটি জাতি সংখ্যায় ছোট হলেও যদি তারা তাদের কাজে ও চিন্তায় সুশৃঙ্খল হয় তবে তারা সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করে, পক্ষান্তরে একটি অর্থ-সম্পদে সমৃদ্ধ জাতিও যদি বিশৃঙ্খল চরিত্রের হয় তবে তারা অতি দ্রুত অধঃপতিত হয়। সৃষ্টিজগতে আমরা যে চূড়ান্ত নিখুঁত শৃঙ্খলা দেখতে পাই, এর পেছনে কারণ সৃষ্টিজগতে বিধাতা অর্থাৎ আদেশকারী একজন। বিশ্বপ্রকৃতির এই শৃঙ্খলা থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে। শৃঙ্খলার প্রথম ধাপ হচ্ছে, যখন কিছু মানুষ কোনো বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হবে তখন তাদের মধ্যে যিনি নেতা থাকবেন তার প্রতিটি কথা সবাই মনোযোগসহকারে শুনবে এবং বুঝে নেবে। নির্দেশনা সঠিকভাবে না বুঝলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ভুল থেকে যাবে। এ শৃঙ্খলা ছাড়া ঐ ঐক্য এক মুহূর্তও টিকবে না।
আনুগত্য:
আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচিটির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আদেশ পালন। আদেশ শোনামাত্র বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে সঙ্গে সঙ্গে সে আদেশ পালন করতে হবে। সমাজের ক্ষুদ্রতম সংগঠন পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত একটি আদেশ দেয়ার ক্ষমতার অধিকারী কর্তৃপক্ষ থাকে। তার আনুগত্য করাই হচ্ছে সেই পরিবার, গোষ্ঠী বা জাতির মেরুদ-। এটা যেখানে দুর্বল সেখানেই অক্ষমতা এবং ব্যর্থতা। ঊর্ধ্বতন নেতার আদেশ পালন করার হুকুম দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। তিনি তাঁর কোর’আনে মো’মেনদেরকে আদেশ করেছেনÑ আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর রসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্য থেকে আদেশকারীর (নেতার) আনুগত্য করো (সুরা নেসা ৫৯)। নির্দেশ পালন না করা হলে ঐক্য ও শৃঙ্খলা যতোই নিখুঁত হোক সেটা অর্থহীন, নিষ্ফল। আধুনিক যুগে আমরা যে রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছি তাতে প্রায়শই দেখা যায়, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখনই কোনো আদেশ বা বিধান দেন, সঙ্গে সঙ্গে জাতির মধ্যে থেকে একটি বড় অংশ এর বিরুদ্ধাচারণ ও সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে যায়। এই ব্যবস্থার কু-প্রভাব এখন সর্বত্র বিরাজমান। পরিবারে সন্তান বাবাকে মানে না, স্ত্রী স্বামীকে মানে না, ছাত্র শিক্ষককে মানে না, এভাবে আমলারা মন্ত্রীদেরকে মানে না, সাংসদরা স্পিকারকে মানে না, ওসি এসপিকে মানে না, বিরোধীদল সরকারকে মানে না। এভাবে সর্বত্র এখন ঊর্ধ্বতনকে না মানার প্রবণতা। কিন্তু মানব ইতিহাসে যে জাতিগুলো শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে তাদের ইতিহাস দেখুন, দেখবেন পাতায় পাতায় সঞ্চিত আছে জাতির নেতৃত্বের প্রতি তাদের অটল আনুগত্যের উজ্জ্বল ইতিহাস। উম্মতে মোহাম্মদির ইতিহাসও তাই। নেতার আনুগত্যের বিষয়ে রসুলাল্লাহ বলেন, ‘কোনো ক্ষুদ্রবুদ্ধি, কান কাটা, নিগ্রো, ক্রীতদাসও যদি তোমাদের নেতা নিয়োজিত হয়, তবে তার কথা বিনা প্রশ্নে, বিনা দ্বিধায় শুনতে ও মানতে হবে।’ কেউ যদি নেতার ভুল ত্রুটির কারণে আনুগত্য করতে অস্বীকার করে তবে মানবসমাজে আনুগত্য বলে কোনো কথাই থাকবে না, কারণ এমন কোনো মানুষ নেই যে ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে। তাই নেতার সিদ্ধান্তের দোষ-ত্রুটির দিকে না দেখে জাতির কল্যাণে, নিজেদের কল্যাণে আনুগত্য করে যেতে হবে।
হেজরত:
হেজরত শব্দের অর্থ শুধু দেশ ত্যাগ করা নয়। হেজরত শব্দের অর্থঃ- “সম্পর্কচ্ছেদ করা, দল বর্জন করা, স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া ভিন্নদেশে গমন করা” (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খ-, পৃঃ ৫৬০-৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)। আল্লাহর রসুল যখন আবির্ভূত হন, তখন আরবীয় গোত্রপতি এবং ধর্মজীবী পুরোহিতদের মুখের কথাই ছিল আইন। তখন যারা ইসলাম গ্রহণ করলেন, রসুলাল্লাহ তাদেরকে নিয়ে সকল সামাজিক অনাচার, অপকর্ম, অশ্লীলতা, মূর্তিপূজা ইত্যাদি থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। বর্তমানে এই জাতিটিও অন্ধভাবে পশ্চিমা তন্ত্রমন্ত্রের আনুগত্য করে যাচ্ছে, আল্লাহর দেয়া ন্যায় নীতির সকল মানদ-কে আমরা অবজ্ঞার চোখে দেখছি। এর কুফল উপলব্ধি করে আমাদেরকে পশ্চিমা মতবাদের অন্ধ আনুগত্য পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ এই তন্ত্র-মন্ত্রগুলো আমাদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির পরিবর্তে অন্যায়, অবিচার, মারামারি, অনৈক্য, বিভেদ, হানাহানি ইত্যাদি বাড়িয়েই চলেছে। আর যারা ধর্মব্যবসা করছে এবং ধর্মকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করছে তাদের সংসর্গও ত্যাগ করতে হবে।
জেহাদ:
কর্মসূচির প্রথম চারটি বিষয় হচ্ছে জাতির চারিত্রিক গঠন-কাঠামো। কিন্তু যে কাজের জন্য এই চরিত্র সেটা হচ্ছে এই পঞ্চম দফা জেহাদ অর্থাৎ সংগ্রাম। মানবজাতির জাতীয় এবং ব্যক্তিগত অর্থাৎ সার্বিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের সংগ্রাম সমাজে প্রচলিত সকল অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, মিথ্যার বিরুদ্ধে। এ জন্য আমাদের জীবন ও সম্পদ পরিপূর্ণরূপে উৎসর্গ করতে হবে। জাতির একটি অংশ যদি নিজেদেরকে মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গ না করে এত বড় কাজ কখনোই করা যাবে না। জেহাদ মানেই হলো অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা। যে সমাজে অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলে না বরং প্রতিনিয়ত অন্যায়, অসত্যের সঙ্গে আপস করা হয়, সেই সমাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বাধ্য।
৪৩ বছর আগে অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন তাদের অপূর্ণই রয়ে গেছে, জাতি হিসাবে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। রাজনীতিক কোন্দল, সহিংসতা, বৈদেশিক ষড়যন্ত্র এবং ধর্মব্যবসায়ীদের অপরিণামদর্শী দেশবিরোধী কর্মকা- দেশকে প্রতিনিয়ত পেছনের দিকে টানছে। সর্বদিকে জাতির যখন নিদারুন অধঃপতন, অন্যায় ও দুর্নীতির সীমাহীন প্রতিযোগিতা চলছে, তখন জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি মহাসুযোগ আল্লাহ দান করেছেন যামানার এমামের মাধ্যমে। তাঁর শিক্ষায় যদি এই জাতি নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তোলে, তাঁর দেখানো পথে যদি এ জাতি চলে তবে এ জাতির উত্থানকে কেউ আর ফিরিয়ে রাখতে পারবে না।
সুতরাং আসুন আমরা শপথ নেই, “এই জাতিটিকে আমরা আল্লাহর দেয়া, রসুলাল্লাহ ও তাঁর প্রকৃত উম্মাহর পালন করে যাওয়া সেই পবিত্র কর্মসূচি মোতাবেক নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হব এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করব। আমরা কেউ কারও ক্ষতি করব না, আমরা অন্যের সম্পত্তি নষ্ট করব না। অন্যায়ভাবে কারও সম্পত্তি গ্রাস করব না। কেউ কারও অগোচরে নিন্দা করব না, যার ভুল তার সামনেই বলব যেন সে সংশোধিত হতে পারে। আমরা ধর্মকে কারও স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হতে দেবো না। আমরা কারও প্ররোচনায় কোনরূপ জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও সহিংসতা করব না। আমরা কোনো রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, রেললাইন নষ্ট করব না। আমরা বিশ্বাস করব, জাতির সম্পদ মানে আমাদেরই সম্পদ। আমরা আমাদের জীবনে, কাজে কর্মে চিন্তায় ব্যবহারে হব সুশৃঙ্খল, আমরা শৃঙ্খলাকে ভালোবাসবো, বিশৃঙ্খলাকে অপছন্দ করব। আমরা আল্লাহ ও রসুলের যে কোনো হুকুমের ব্যাপারে মতবিরোধ করব না, সেগুলোকে আমাদের জন্য মঙ্গলময় বলে বিশ্বাস করব এবং সেগুলোর দ্বিধাহীন আনুগত্য করব। আমরা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া অসার, আত্মাহীন, প্রতারণা ও চাতুর্যপূর্ণ মিথ্যার উপর ভিত্তি করা মতবাদগুলো পরিত্যাগ করব এবং আমরা সবাই মৃত্যু পর্যন্ত সকল অন্যায় অবিচার ও অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাব ইনশা’আল্লাহ।”

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ